ইতিহাসের পথে এক যাত্রা: যশোর হয়ে ঢাকার পথে ভারতীয় দূত

ভারতের মনোনীত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী শুক্রবার কলকাতা থেকে যশোর হয়ে সড়কপথে ঢাকায় তাঁর নতুন দায়িত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছেন। এই যাত্রাপথ এমন এক সড়ক ধরে, যা ভারত ও বাংলাদেশের অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের যৌথ ইতিহাসের ভার বহন করে চলেছে।

 

ভারত ও বাংলাদেশের সম্মিলিত স্মৃতিতে যশোরের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ বাহিনী এই সেক্টরে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের পরাজিত করে ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার অন্যতম প্রধান পথ উন্মুক্ত করেছিল।


 

যশোরের পতন মুক্তিযুদ্ধের এক নির্ণায়ক মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়। একই সময়ে ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী সংসদে ঘোষণা করেন যে, “বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির সতর্ক মূল্যায়নের” পর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।

 

এই ঘোষণার পর ভারতীয় সংসদে টেবিল চাপড়ে এবং “জয় বাংলা” ধ্বনিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন সাংসদরা।

 

তবে এই পথের গুরুত্ব কেবল সামরিক ইতিহাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে নভেম্বরের অন্ধকার সময়ে, যখন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস দমন-পীড়নের মুখে লাখ লাখ বাংলাদেশি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, তখন কলকাতা-যশোর সড়কটি ছিল তাদের অন্যতম প্রধান আশ্রয়পথ।

 

পুরুষ, নারী ও শিশু—অসংখ্য মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে পূর্ব ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা সঙ্গে করে এনেছিলেন শুধু স্মৃতি আর বেঁচে থাকার আশা। ইতিহাসে বিরল এক গণহত্যার হাত থেকে বাঁচতেই ছিল তাদের এই যাত্রা।

 

এই শরণার্থী সংকট পরবর্তীকালে বিংশ শতাব্দীর বৃহত্তম মানবস্থানান্তরগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠে এবং তা ভারতের নীতিগত অবস্থান, যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

 

এই পথের ধারে প্রত্যক্ষ করা মানবিক বিপর্যয়কে অমর করে রেখেছেন মার্কিন কবি ও গায়ক-গীতিকার অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-এ। পরবর্তীকালে কবিতাটি গানেও রূপান্তরিত হয়। গিন্সবার্গ ভারত ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী বনগাঁর শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছিলেন বিশিষ্ট ভারতীয় সাহিত্যিক ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

 

গানের সেই পঙ্‌ক্তিগুলো —“Millions of souls nineteen seventy one/homeless on Jessore road under grey sun/A million are dead, the million who can/Walk toward Calcutta from East Pakistan …” — পশ্চিমা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল—যে সময়ে রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমের বহু শক্তি পাকিস্তানের সামরিক শাসনকেই সমর্থন করছিল।

 

বিশ্বের বহু মানুষের কাছে যশোর রোড ১৯৭১ সালের শরণার্থীদের দুর্ভোগ, অদম্য সহনশীলতা এবং সংগ্রামী মনোবলের প্রতীক হয়ে ওঠে।

 

যশোর শহর আরও প্রাচীন ইতিহাসেরও সাক্ষী। চার শতাব্দীরও বেশি আগে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য, বাংলার বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী শাসক, এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ও মধ্য বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকা শাসন করতেন।

 

আজ, যখন পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ভারত ও বাংলাদেশ তাদের সম্পর্ককে নতুনভাবে বিন্যস্ত করার চেষ্টা করছে, তখন ত্রিবেদীর এই যাত্রা এমন এক করিডর অনুসরণ করছে, যা সাম্রাজ্য, প্রতিরোধ, যুদ্ধ, অভিবাসন এবং মুক্তির ইতিহাসের সাক্ষী।

 

দক্ষিণ এশিয়ায় খুব কম সড়কই এত স্তরের অভিন্ন ইতিহাসকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছে। সপ্তদশ শতাব্দীর মুঘল অভিযান থেকে ১৯৭১ সালের শরণার্থীদের মিছিল ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম, এবং আজকের একবিংশ শতাব্দীর কূটনীতি—সবকিছুরই নীরব সাক্ষী যশোরের এই পথ। ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে স্থায়ী ও গভীর সম্পর্কের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে আজও তা ইতিহাস বহন করে চলেছে।