ভারত ও জাপানের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর করার সিদ্ধান্ত বর্তমান ইন্দো-প্যাসিফিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃহস্পতিবার ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি যে বৈঠক করেছেন, তার মধ্য দিয়ে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেল। সামুদ্রিক নিরাপত্তা, তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ সামরিক মহড়া, জাহাজ মেরামতের সুযোগ এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে যৌথ উদ্যোগ— সব মিলিয়ে এই সহযোগিতা ভারতের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার পক্ষে ইতিবাচক পদক্ষেপ।
ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই সহযোগিতা শুধু সামরিক মহড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দুই দেশ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ভারত মহাসাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের একটি বড় অংশ সমুদ্রপথে হয়। ফলে এই পথগুলির নিরাপত্তা ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা সেই নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তথ্য আদান-প্রদানও এই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সামুদ্রিক ক্ষেত্রে কোন জাহাজ কোথায় চলছে, কোথাও অস্বাভাবিক সামরিক তৎপরতা হচ্ছে কি না— এই ধরনের তথ্য দ্রুত ভাগ করে নেওয়া হলে দুই দেশের নৌবাহিনীর পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা আরও স্পষ্ট হবে। অনুসন্ধান ও উদ্ধার, বন্দর ব্যবহার, রসদ সরবরাহ এবং জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ক্ষেত্রে সহযোগিতাও ভারতীয় নৌবাহিনীর কার্যক্ষমতা বাড়াতে
সাহায্য করবে।
ভারতের শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকেও এই সমঝোতার গুরুত্ব যথেষ্ট। জাপানের উন্নত প্রযুক্তি এবং ভারতের বৃহৎ উৎপাদন ক্ষমতাকে একত্র করে ভবিষ্যতে নৌযান নির্মাণ ও নকশার ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-কে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এর ফলে বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ওপর ভারতের নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন প্রযুক্তি, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রতিরক্ষা গবেষণার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা আশাব্যঞ্জক। ভারতের ডিআরডিও এবং জাপানের সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইউএনআইসিওআরএন যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রকল্পকে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রথম প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ধরনের প্রকল্প সফল হলে ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি সহযোগিতার দরজা খুলবে।
যৌথ সামরিক মহড়ার পরিধি বাড়ানোও ভারতের জন্য লাভজনক। ‘ধর্ম গার্ডিয়ান’ এবং ‘জাইমেক্স’-এর মতো মহড়া দুই দেশের সেনা ও নৌবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ায়। এ বছরের ‘বীর গার্ডিয়ান ২৬’ মহড়ায় জাপানি যুদ্ধবিমান প্রথমবারের মতো ভারতে অংশ নেবে। এর ফলে দুই দেশের বিমানবাহিনীর বাস্তব পরিস্থিতিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও সমন্বয় আরও উন্নত হবে।
এই সহযোগিতার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল কূটনৈতিক ভারসাম্য। ভারত ও জাপান কোনও দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক জোট গড়ার কথা বলছে না। বরং তারা বলেছে, বলপ্রয়োগ বা চাপ সৃষ্টি করে বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয় এবং ইন্দো-প্যাসিফিককে মুক্ত ও উন্মুক্ত রাখা দরকার। দক্ষিণ ও পূর্ব চিন সাগরে সামরিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের সময় এই অবস্থান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের স্বার্থে এমন একটি আঞ্চলিক পরিবেশ দরকার যেখানে আন্তর্জাতিক আইন, স্বাধীন নৌচলাচল এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্তের অধিকার বজায় থাকবে।
ভারত-জাপান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
1093162316
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সহযোগিতার পরিকল্পনাটিও ইতিবাচক। ইন্দো-প্যাসিফিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দুর্যোগকবলিত দেশগুলিকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ দেখায় যে ভারত-জাপান অংশীদারিত্ব শুধু সামরিক নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানবিক সহায়তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুতরাং ভারত-জাপান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভারতের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ। এতে ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে, দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়বে, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার সম্ভব হবে এবং ইন্দো-প্যাসিফিকে ভারতের ভূমিকা আরও দৃঢ় হবে। তবে এই সহযোগিতার সাফল্য নির্ভর করবে দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর। প্রস্তাবিত নতুন ওয়ার্কিং গ্রুপ যদি গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি, সামরিক কার্যক্রম ও শিল্প সহযোগিতাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারে, তবে ভারত-জাপান সম্পর্ক আগামী দিনে শুধু দুই দেশের নিরাপত্তার স্তম্ভ নয়, সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিকের শান্তি ও স্থিতিশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।