প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ১৩৮তম ‘মন কি বাত’-এর ভাষণে একাধিক জাতীয় বিষয় উঠে এসেছে। তবে ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দেশের নীতির পরিবর্তনের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। ২০১৬ সালের ২৮-২৯ সেপ্টেম্বরের সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের দশ বছর পূর্তির প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী এই অভিযানকে ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরেছেন।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের শিকার। দিল্লির ২০০৮ সালের ধারাবাহিক বিস্ফোরণ কিংবা একই বছরের ২৬/১১ মুম্বাই হামলা সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট— সন্ত্রাসবাদ শুধু নিরাপত্তার সমস্যা নয়, এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবন, অর্থনীতি এবং দেশের আত্মবিশ্বাসের উপরও আঘাত। তাই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যে কোনও সরকারেরই মৌলিক দায়িত্ব।
২০১৬ সালের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের নিরাপত্তা-নীতির একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, তার পর ২০১৯ সালের বালাকোট বিমান হামলা থেকে সাম্প্রতিক ‘অপারেশন সিঁদুর’ পর্যন্ত ভারত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। এর মূল বার্তা হল, ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে। তবে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি এটিও মনে রাখা দরকার যে, সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা একটি দীর্ঘমেয়াদি কাজ। গোয়েন্দা তথ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দেশের অভ্যন্তরে সামাজিক সম্প্রীতি— সবকিছুর সমন্বয়েই এই লড়াইকে কার্যকর করা সম্ভব।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থান তাই কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই হবে না। সন্ত্রাসের অর্থের জোগান বন্ধ করা, সন্ত্রাসী সংগঠনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, সীমান্তপারের পরিকাঠামো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একটি অভিন্ন ও কার্যকর নীতির দাবি জানিয়ে আসছে। কোনও দেশের মাটিকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস চালানোর কাজে ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না— এই নীতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভারতের নিরাপত্তার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ৯/১১ হামলার ২৫ বছর পূর্তির উল্লেখও তাৎপর্যপূর্ণ। সন্ত্রাসবাদ কোনও একটি দেশ বা অঞ্চলের সমস্যা নয়, এর প্রভাব আন্তর্জাতিক। সেই হামলায় ভারতীয় নাগরিকরাও প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সহযোগিতা বাড়ানো তাই ভারতের স্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। ভারতের অবস্থান হওয়া উচিত পরিষ্কার— নিরীহ মানুষের উপর সন্ত্রাসী হামলার কোনও ন্যায্যতা নেই।
‘মন কি বাত’-এর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জনগণনা। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিতে জনগণনার প্রথম পর্যায় প্রায় শেষ এবং ৩২ কোটিরও বেশি পরিবারের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। দুর্গম ও তুষারাবৃত এলাকাতেও এই কাজ চলছে। জনগণনা নিছক সরকারি হিসাব নয়। দেশের জনসংখ্যা, পরিবার, সামাজিক অবস্থান এবং বিভিন্ন পরিবর্তনের নির্ভরযোগ্য তথ্য ভবিষ্যতের পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, খাদ্য, কর্মসংস্থান বা পরিকাঠামো— সব ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই জনগণনায় নাগরিকের সঠিক তথ্য দেওয়াও জাতীয় দায়িত্ব।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন দেশের উন্নয়নের কাজে প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণ। পরিবেশ সংরক্ষণ, পুষ্টি, গ্রামীণ জীবিকা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সেই বৃহত্তর জাতীয় দায়িত্বের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
একটি নিরাপদ ভারত গড়ার জন্য শুধু সেনাবাহিনী বা নিরাপত্তা সংস্থার উপর নির্ভর করলে চলবে না। রাষ্ট্রকে যেমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে, তেমনই নাগরিকদেরও সতর্ক, দায়িত্বশীল এবং ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ভারতের বার্তা যতটা দৃঢ়, তার সঙ্গে ততটাই জরুরি শান্তি, উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখা। নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন— এই দুইয়ের সমন্বয়েই শক্তিশালী ভারতের ভিত্তি আরও মজবুত হতে পারে।