ভারতের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল গণনা: প্রক্রিয়া ও কিছু উদ্বেগ

CENSUS - AI

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ, যার প্রশাসনিক পরিকল্পনা, নীতি নির্ধারণ এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের একটি প্রধান ভিত্তি হলো জনগণনা। স্বাধীনতার পর থেকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর এই গণনা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, কিন্তু প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবারই প্রথম দেশজুড়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে গণনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের তথ্য সংগ্রহের ধরন, নাগরিক অংশগ্রহণের প্রকৃতি এবং শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা— সবকিছুকেই নতুনভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
এই নতুন ব্যবস্থায় নাগরিকরা সরাসরি অনলাইনের মাধ্যমে নিজেদের পরিবারের তথ্য জমা দিতে পারবেন, যাকে বলা হচ্ছে স্ব-গণনা। এটি একদিকে যেমন সময় বাঁচাতে পারে, অন্যদিকে প্রশাসনের উপর চাপ কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ, সামাজিক বাস্তবতা এবং নাগরিকদের মধ্যে কিছু উদ্বেগও।
প্রথমেই আসা যাক ডিজিটাল গণনার কাঠামো নিয়ে। এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপটি হলো গৃহ-তালিকা বা হাউসলিস্টিং পর্যায়, যেখানে বাড়ি ও আবাসন সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে ব্যক্তিগত তথ্য যেমন বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা, পেশা ইত্যাদি নথিভুক্ত করা হয়। ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রথম ধাপেই স্ব-গণনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যাতে নাগরিকরা নিজেরাই তাঁদের বাড়ির তথ্য অনলাইনে জমা করতে পারেন।
এই অনলাইন ব্যবস্থায় অংশ নিতে হলে একটি সক্রিয় মোবাইল নম্বর এবং ইন্টারনেট সংযোগ প্রয়োজন। নাগরিকদের একটি নির্দিষ্ট পোর্টালে লগ-ইন করতে হয় এবং বিভিন্ন ধাপে তথ্য পূরণ করতে হয়। প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোবাইলে ওটিপি পাঠানো হয়। এর ফলে তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখা সহজ হয় বলে প্রশাসনের দাবি।
তবে এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জিওলোকেশন নির্ধারণ। ব্যবহারকারীকে একটি ডিজিটাল মানচিত্রে নিজের বাড়ির অবস্থান চিহ্নিত করতে হয়। এই তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে গণনাকারী কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট পরিবারে পৌঁছবেন। ফলে ভুলভাবে অবস্থান নির্ধারণ করলে বাস্তবিক গণনার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গ্রামীণ বা অপ্রাতিষ্ঠানিক বসতিতে অনেক সময় সুনির্দিষ্ট ঠিকানা বা ম্যাপিং স্পষ্ট থাকে না।
স্ব-গণনার সময় নাগরিকদের মূলত আবাসন সংক্রান্ত তথ্য দিতে হয়। যেমন— বাড়ির ধরন (কাঁচা, পাকা বা আধাপাকা), মালিকানা, পানীয় জলের উৎস, শৌচাগারের ব্যবস্থা, রান্নার জ্বালানি, বিদ্যুৎ সংযোগ, যোগাযোগের সুবিধা ইত্যাদি। এই তথ্যগুলো দেশের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিকল্পনাকারীরা এই তথ্যের ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প তৈরি করেন।
অনলাইন ফর্ম পূরণ সম্পন্ন হলে একটি নির্দিষ্ট পরিচয় নম্বর তৈরি হয়, যা পরবর্তী যাচাইকরণের জন্য প্রয়োজনীয়। সরকারি গণনাকারীরা যখন বাড়িতে যাবেন, তখন এই নম্বরটি জানাতে হবে। এর ফলে তথ্য যাচাইয়ের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। তবে যদি কেউ এই নম্বর হারিয়ে ফেলেন, তাহলে মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে সেটি পুনরুদ্ধার করার সুযোগ রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনও নথি বা পরিচয়পত্র জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এটি অনেকের কাছে স্বস্তিদায়ক হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার কারণে কিছু নাগরিকের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব মানুষ পূর্বে নিজেদের পরিচয় প্রমাণ করতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, তাঁরা এই নতুন প্রক্রিয়া নিয়েও কিছুটা সংশয়ে রয়েছেন।
এই উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের মানসিক চাপ। বারবার নথি সংগ্রহ, যাচাই এবং সংশোধনের মতো কাজ সাধারণ মানুষের কাছে ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে। যদিও গণনার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা— এটি নাগরিকত্ব নির্ধারণের জন্য নয়, বরং তথ্য সংগ্রহের জন্য— তবুও মানুষের অভিজ্ঞতা তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা। বিশেষ করে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়ার বিষয়টি নিয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অতীতে দেখা গেছে, নির্বাচন বা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে শিক্ষকদের ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। এর ফলে শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ডিজিটাল ব্যবস্থায় যদিও ধারণা করা হচ্ছে কাজ সহজ হবে, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা উল্টো হতে পারে। কারণ, তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সেটি অনলাইনে আপলোড করার দায়িত্বও কর্মীদের ওপর বর্তাবে। এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সময় এবং পর্যাপ্ত পরিকাঠামো— যা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে সহজলভ্য নয়।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ, স্মার্টফোন ব্যবহার এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক মানুষই অনলাইনে তথ্য পূরণ করতে স্বচ্ছন্দ নন। ফলে তাঁদের ক্ষেত্রে আবার প্রচলিত পদ্ধতিতে গণনাকারীদের ওপর নির্ভর করতে হবে।
তবে ডিজিটাল গণনার কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধাও রয়েছে। প্রথমত, এটি সময় সাশ্রয়ী। দ্বিতীয়ত, তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ সহজ হয়। তৃতীয়ত, তথ্যের ভুল কমানোর সম্ভাবনা থাকে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— এটি ভবিষ্যতের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ করে তুলতে পারে।
এই গণনার তথ্যের ব্যবহারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প, অবকাঠামো পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নীতি— সবকিছুর ভিত্তি হিসেবে এই তথ্য ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ বা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্তমানে দেশে নির্বাচনী এলাকা পুনর্বিন্যাস নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তার সঙ্গে এই গণনার সম্পর্ক রয়েছে। কারণ, জনসংখ্যার ভিত্তিতেই আসনের সংখ্যা ও সীমানা নির্ধারণ করা হয়। ফলে এই গণনা শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ডিজিটাল গণনা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর— নাগরিকদের অংশগ্রহণ, প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো, সরকারি কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
নাগরিকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা এই প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। তাঁদের বুঝতে হবে যে, এই তথ্য শুধুমাত্র উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহৃত হবে এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনকেও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে এবং যে কোনও বিভ্রান্তি দূর করতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ভারতের এই প্রথম ডিজিটাল গণনা একটি নতুন দিগন্তের সূচনা। এটি যেমন সুযোগের দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনি সামনে এনেছে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও। সঠিক পরিকল্পনা, সচেতনতা এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই উদ্যোগ সফল হলে, তা ভবিষ্যতের প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করে তুলতে সক্ষম হবে।