ভারত–ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিছক একটি অর্থনৈতিক সমঝোতা নয়, এটি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বদলের এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। দিল্লির প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে ইউরোপীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি যতটা প্রতীকী, তার চেয়েও অনেক বেশি বাস্তব ও গভীর এই চুক্তির তাৎপর্য। দীর্ঘদিনের আলোচনার পর যে বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে উঠল, তা ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।

এই চুক্তিকে উভয় পক্ষই ‘সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তি’ বলে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু এর গুরুত্ব শুধু শুল্ক ছাড় বা বাজার সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা, কৌশলগত বোঝাপড়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পারস্পরিক নির্ভরতার ইঙ্গিত— সব মিলিয়ে এটি এক নতুন বাস্তববাদের জন্ম দিচ্ছে।

বিশ্ব-রাজনীতির এই বদলের পেছনে একটি বড় প্রেক্ষাপট হল আমেরিকার ক্রমশ অনিশ্চিত ও আত্মকেন্দ্রিক ভূমিকা। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার ঐতিহ্যগত মিত্রতা নানা টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে। শুল্ক আরোপ, ভূখণ্ড নিয়ে আগ্রাসী বক্তব্য— এমনকি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে প্রকাশ্য আগ্রহ— ইউরোপকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে ওয়াশিংটনের উপর একচেটিয়া নির্ভরতা আর নিরাপদ নয়।


এই পরিস্থিতিতে ইউরোপ বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। আর সেই বিকল্প হিসেবে ভারতের মতো একটি বড়, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিসম্পন্ন দেশ স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ভারত বহুদিন ধরেই দেখিয়ে এসেছে যে, সে কোনও একক শক্তি ব্লকের অধীন নয়। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, একই সঙ্গে পশ্চিমের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা— এই ভারসাম্য বজায় রাখার নীতিই আজ ভারতের কূটনৈতিক শক্তি।

রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে অতীতে যেভাবে ভারতকে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল, বাস্তবে সেই অভিযোগের নৈতিক জোর কতখানি! ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপ নিজেই দীর্ঘ সময় রাশিয়ান শক্তির উপর নির্ভরশীল থেকেছে। আজ সেই দ্বিচারিতা চাপা পড়ে যাচ্ছে বাস্তব স্বার্থের নিচে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিকতার চেয়ে বাস্তবতার জয়— এ নতুন নয়, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা আরও স্পষ্ট।

আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন, উচ্চ শুল্ক আরোপ এবং বাণিজ্য আলোচনায় বারবার অচলাবস্থার মুখে পড়ে ভারতও তার রপ্তানি ও বাণিজ্য গন্তব্য বহুমুখী করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছে। ইউরোপের বাজার, তার প্রযুক্তি ও আর্থিক শক্তি— এই সবই ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে ইউরোপ ভারতের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীল প্রবেশাধিকার খুঁজছে, বিশেষত এমন এক সময়ে যখন চিনের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে ইউরোপ নিজেই চিন্তিত।

এই চুক্তির আওতায় ভারতের প্রায় ৯৭ শতাংশ পণ্যে ইউরোপে শুল্ক ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় রপ্তানিকারকদের জন্যও বড় স্বস্তি— বিশেষ করে, বিলাসবহুল গাড়ি ও উচ্চমূল্যের পণ্যে শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে। অর্থনৈতিক দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে ‘উইন–উইন’।

তবে অর্থনীতির বাইরেও এই চুক্তির আরেকটি বড় দিক হল নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। সাম্প্রতিক নিরাপত্তা চুক্তি দেখিয়ে দিচ্ছে যে পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তি ক্রমশ মজবুত হচ্ছে। বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণা, যেখানে একক কোনও শক্তি সব নিয়ন্ত্রণ করবে না— এই ভাবনাই আজ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এক সময় বিশ্ব রাজনীতি মার্কিন নেতৃত্বে আবর্তিত হতো। কিন্তু আজ সেই একাধিপত্য প্রশ্নের মুখে। ইউরোপ ও ভারতের এই ঘনিষ্ঠতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে বিশ্ব এখন বহু-কেন্দ্রিক (multipolar)। ইউরোপ ও ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সাম্প্রতিক আচরণে সেই পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়েছে।

সব মিলিয়ে ভারত–ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বর্তমান সময়ের বাস্তবতারই প্রতিফলন। আদর্শের বদলে স্বার্থ, নীতিকথার বদলে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতি— এই সমীকরণেই আজ বিশ্ব রাজনীতি এগোচ্ছে। আর সেই সমীকরণে ভারত ও ইউরোপ একে অপরের জন্য ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।