বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপও দীর্ঘমেয়াদি অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকার দ্বিধা তাই শুধু একটি সফরের সময়সূচির প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে টানাপোড়েন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির উচিত চাপ সৃষ্টি না করে ঢাকাকে কিছুটা রাজনৈতিক অবকাশ দেওয়া।
ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে যে সংলাপ ও পারস্পরিক স্বার্থের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, তা আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশ যেমন তার ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির কথা বলছে, তেমনই ভারতেরও বোঝা প্রয়োজন যে প্রতিবেশী দেশের নতুন সরকারের নিজস্ব রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রাখা। বিশেষ করে ইসলামপন্থী শক্তির প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি এই সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। দিল্লিতে থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। কিন্তু এই একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশের সামগ্রিক সম্পর্ককে আটকে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ঢাকার অবস্থান যে শুধু আবেগ বা ভারতের প্রতি অনাস্থা থেকে তৈরি হচ্ছে, এমন ভাবারও কারণ নেই। তারিক রহমানকে দেশের অভ্যন্তরে নানা রাজনৈতিক চাপ সামলাতে হচ্ছে। ফলে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখলেও তাঁকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানও রক্ষা করতে হচ্ছে।
এই জায়গাতেই ভারতের কূটনৈতিক দূরদর্শিতার প্রয়োজন। দিল্লি ইতিমধ্যে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ করেছে। মন্ত্রী পর্যায়ের সফর হয়েছে, ভিসা পরিষেবা ফের চালু হয়েছে এবং নতুন হাইকমিশনার নিয়োগ করা হয়েছে। দীনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন বাংলা ভাষায় দক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ঢাকায় পাঠানোর মধ্যেও সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা রয়েছে। এখন প্রয়োজন আরও কিছু দৃশ্যমান ও বাস্তব পদক্ষেপ।
তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই সমস্যার সমাধানে ভারত যদি আন্তরিক উদ্যোগ নেয়, তবে তা বাংলাদেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে। একই সঙ্গে ঋণ বা আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতা, বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ রফতানি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বাস্তব ভিত্তি দিতে পারে।
কূটনীতিতে সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব নয়। কিছু প্রশ্ন সময় নিয়ে মেটাতে হয়, কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য রেখেই এগোতে হয়। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়েও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মতবিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু সেই মতবিরোধ যেন বাকি সম্পর্ককে গ্রাস না করে, সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের জন্য বাংলাদেশ শুধু একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যদিকে বাংলাদেশের কাছেও ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত মূল্যবান।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক
প্রতীকী চিত্র
তাই তারেক রহমানের সফর নিয়ে তাড়াহুড়ো বা প্রকাশ্য চাপ নয়, প্রয়োজন ধৈর্য এবং আস্থার পরিবেশ তৈরি করা। দিল্লি যদি ঢাকাকে কিছুটা রাজনৈতিক পরিসর দেয় এবং একই সঙ্গে বাস্তব সুবিধা দেওয়ার পথে এগোয়, তবে সম্পর্কের কঠিন প্রশ্নগুলিও ধীরে ধীরে সহজ হতে পারে। প্রতিবেশীকে কোণঠাসা করে নয়, পাশে রেখে এগোনোই ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের পক্ষে বেশি কার্যকর।