সৈয়দ হাসমত জালাল
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকে সাধারণত ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের সরল দ্বিখণ্ডিত ছকে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এই ছক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরকে আড়াল করে রাখে, তা হলো— বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ত্রিভুজ সম্পর্ক। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পারস্পরিক সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক সমীকরণ নয়— এটি ইতিহাস, স্মৃতি, আদর্শ ও নিরাপত্তার জটিল মেলবন্ধন। ২০২৪ সালের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এই ত্রিভুজকে আবার নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
এই ত্রিভুজ সম্পর্কের মূল ভিত্তি ১৯৭১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে একটি বাঁকবদল। ভারত এই যুদ্ধে শুধুমাত্র সামরিকভাবেই জড়িত ছিল না, রাজনৈতিক ও নৈতিক অর্থেও বাংলাদেশের জন্মের অংশীদার ছিল ভারত। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই পর্বটি ছিল ভৌগোলিক বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় অপমান ও তাদের আদর্শের ক্ষেত্রে একটি বড় ধাক্কা।
আর এই ধাক্কার স্মৃতিই ত্রিভুজের চরিত্র নির্ধারণ করেছে। ভারতের কাছে বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের ‘বন্ধু রাষ্ট্র’। পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশ এক সময়ের ‘বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড’, আর বাংলাদেশের কাছে ভারত মুক্তিদাতা হলেও, অনেকের কাছে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছেদের স্মৃতি গভীর যন্ত্রণার। কিন্তু ইতিহাসের এই মানচিত্র স্থির থাকে না, রাজনীতি বদলালে স্মৃতির পাঠও বদলায়।
এই ত্রিভুজে সবচেয়ে সংবেদনশীল অবস্থান বাংলাদেশের। ভৌগোলিকভাবে ভারতবেষ্টিত হলেও সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে বহুমাত্রিক। এক দিকে ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার, অন্য দিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয়— এই দ্বৈততা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে।
যখনই বাংলাদেশে ধর্মনির্ভর বা মৌলবাদী রাজনীতি শক্তিশালী হয়েছে, তখনই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হয়েছে। ‘ইসলামিক সংহতি’র বয়ান তখন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে কিছুটা আড়াল করে দেয়। এর বিপরীতে, ধর্মনিরপেক্ষ ও মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক রাজনীতির সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক গভীর হয়েছে। অর্থাৎ এই ত্রিভুজে বাংলাদেশ কোনও স্থায়ী মেরু নয়, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছুটা পরিবর্তনশীল ও ভারসাম্য বজায় রক্ষা করে চলেছে।
পাকিস্তানের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ শুধু তাদের অতীতের ক্ষতই নয়, একটি কৌশলগত সম্ভাবনাও বটে। পশ্চিম সীমান্তে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বে জর্জরিত পাকিস্তান বহুদিন ধরেই ভারতের পূর্ব সীমান্তের উপর নজর রেখেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলির সঙ্গে অতীতে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ এই কৌশলেরই অংশ ছিল।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ভারত-বিরোধী আবহ তৈরি হলে পাকিস্তানের সক্রিয়তা বাড়ে, তা বহুবার দেখা গিয়েছে। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ার ইঙ্গিত ভারতের কাছে তাই নিছক প্রতীকী নয়, এটি নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগেরও বিষয়।
যদিও ভারত এই ত্রিভুজে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র, কিন্তু একই সঙ্গে সবচেয়ে দ্বিধাগ্রস্তও। এক দিকে, ভারত চায় বাংলাদেশ যেন পাকিস্তানঘেঁষা পথে না যায়। অন্য দিকে, বাংলাদেশের উপর অতিরিক্ত প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ভারতের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে— এই দ্বিধা ভারতের বিদেশনীতিতে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়।
সম্প্রতি বাংলাদেশে দীপুচন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ভারতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আবেগ তৈরি করেছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে। অবশ্যই অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ধিক্কারযোগ্য এই এ হত্যাকাণ্ড। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই ভয়াবহ ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেই হয়। ভারত সরকারও এই ঘটনার নিন্দা করে কড়া বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশকে। কিন্তু সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতেই হয়, এই আবেগ যদি কূটনীতির ভাষায় রূপ নেয়, তবে তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত-বিরোধী শক্তিকেই সুবিধা করে দেয়, যার সুযোগ নিতে প্রস্তুত থাকে পাকিস্তান।
এই ত্রিভুজ সম্পর্কের বিপজ্জনক দিক হল— বাংলাদেশ যদি মনে করে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মানেই তাদের সার্বভৌমত্বের ক্ষয়, তবে তারা বিকল্প খুঁজবে। পাকিস্তান সেই বিকল্পের এক অংশ হতে পারে, যেমনটি হতে পারে চিনও। এতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি আরও বহুমুখী হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু তাতে আরও অস্থিরতা বাড়বে। তাই ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হল— বাংলাদেশকে এমন এক অবস্থানে রাখা যেখানে সে কোনও এক মেরুর উপগ্রহ না হয়ে স্বতন্ত্র অংশীদার হতে পারে। এই ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান ত্রিভুজ সম্পর্ক ভাঙার নয়, বরং নতুন করে তাকে বোঝার সময় এসেছে। ভারত যদি বাংলাদেশকে কেবল পাকিস্তান-বিরোধী কৌশলের অংশ হিসেবে দেখে, তবে তা সম্পর্ককে সংকীর্ণ করবে। আবার বাংলাদেশ যদি ভারতকে একমাত্র আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী হিসেবে চিহ্নিত করে, তবে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তাকে দীর্ঘমেয়াদে অস্থিরতার দিকেই ঠেলে দেবে।
এই ত্রিভুজ থেকে বেরোনোর একমাত্র পথ হল, ইতিহাসকে অস্বীকার না করেও ইতিহাসের মধ্যে বন্দি না হয়ে থাকা। সংযত কূটনীতি, বহুমাত্রিক যোগাযোগ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দায়িত্বশীল ভাষা— এই তিনের সমন্বয়ই দক্ষিণ এশিয়ার এই নীরব ত্রিভুজকে সহনীয় ভারসাম্যে রাখতে পারে।