ভারত ও চিনের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাধা সীমান্ত সমস্যা। ব্রিটিশ আমলে তৈরি ম্যাকমোহন লাইন নিয়ে বিতর্ক স্বাধীনতার পরও মেটেনি। অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চিন। ফলে ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা রয়েছে। এই পুরনো সমস্যার সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি যোগ হওয়ায় ভারত-চিন সম্পর্ক আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের চিন সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য যে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ব্যবস্থা রয়েছে, তার ২৫তম বৈঠকে ডোভালের অংশগ্রহণ নিছক কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি বরাবর শান্তি বজায় রাখা এখন ভারত ও চিন— দুই দেশেরই অন্যতম প্রধান প্রয়োজন।
কারণ অতীত খুব সুখকর নয়। সীমান্ত বিরোধ একসময় দুই দেশকে ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিল। তারপরও নানা সময়ে সীমান্তে সংঘর্ষ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান-সহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়। এর ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ে।
তবে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা এবং আমেরিকার নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতি এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তির সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ভারত ও চিন— দুই দেশই নানা দিক থেকে মার্কিন নীতির চাপ অনুভব করছে। শুল্ক বৃদ্ধি, নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক বাধা কিংবা অভিবাসন নীতির কঠোরতা— সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এই অবস্থায় ভারত ও চিনের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই। দুই দেশের মধ্যে বিপুল বাণিজ্য রয়েছে। কিন্তু শুধু বাণিজ্য বাড়লেই সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না। সীমান্তে যদি অবিশ্বাস থেকে যায়, তাহলে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিতও দুর্বল থাকবে। তাই সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
গত দুই বছরে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে। ২০২৪ সালে রাশিয়ায় ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হয়েছে। পরের বছর চিনে সাংহাই
কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনেও দুই নেতার সাক্ষাৎ হয়। আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের সম্ভাবনাও নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। ডোভাল ও চিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র বৈঠক সেই সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের জন্য প্রস্তুতি হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি সতর্ক থাকাও জরুরি। সীমান্তে শান্তি ফিরিয়ে আনার অর্থ এই নয় যে রাতারাতি ভূখণ্ডের বিরোধ মিটে যাবে। দুই দেশের সীমান্ত-দাবি, নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানে সময় লাগবে। কিন্তু মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সংঘাত এড়িয়ে চলা সম্ভব— এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি লক্ষ্য হওয়া উচিত।
ভারতের অবস্থানও তাই স্পষ্ট হওয়া দরকার। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ছাড়া স্বাভাবিক সম্পর্ক সম্ভব নয়। আলোচনার দরজা খোলা রাখতে হবে, কিন্তু দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও আপস করা যাবে না। একই সঙ্গে চিনের সঙ্গেও এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে যেখানে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিযোগিতা যেন সংঘাতে পরিণত না হয়।
ভারত ও চিন দুটিই বিশাল দেশ, দুটিরই দীর্ঘ ইতিহাস, বিপুল জনসংখ্যা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি রয়েছে। পরস্পরের সঙ্গে স্থায়ী সংঘাত কারও স্বার্থে নয়। বরং এশিয়ার ভবিষ্যৎ স্থিতিশীল রাখতে দুই দেশের দায়িত্বও কম নয়। তাই ডোভালের সাম্প্রতিক বৈঠক থেকে যদি একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব
পায়, তা হওয়া উচিত— সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং ধীরে ধীরে আস্থা
ফিরিয়ে আনা।
ভূখণ্ডের বিরোধের চূড়ান্ত সমাধান আজই সম্ভব না হলেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ তৈরি করা সম্ভব। সেই পথেই ভারতকে দৃঢ়ভাবে এগোতে হবে। কারণ প্রতিবেশীর সঙ্গে স্থায়ী সংঘাত নয়, শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা ও প্রয়োজনভিত্তিক সহযোগিতাই ভবিষ্যতের বাস্তবসম্মত পথ।