অবিনশ্বর সোমনাথ: সহস্র বছরের ধ্বংস ও সৃষ্টির আলেখ্য

ফাইল চিত্র

সুজনকুমার দাস

ভারতের সুপ্রাচীন ইতিহাসের পাতায় সোমনাথ মন্দির কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং এটি একটি জাতির অপরাজেয় মানসিকতা এবং পুনরুত্থানের জীবন্ত মহাকাব্য। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গুজরাতের প্রভাস পাটানে সোমনাথ মন্দিরের ‘অমৃত পর্ব’ অনুষ্ঠানে যোগদান এই মন্দিরের গুরুত্বকে পুনরায় বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। স্বাধীনতার পর এই ঐতিহাসিক মন্দিরের পুনর্নির্মাণ ও প্রাণ-প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই মহাপূজায় প্রধানমন্ত্রী সোমনাথকে ভারতের ‘চিরন্তন সভ্যতা’র প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মূলে রয়েছে সোমনাথের সেই বিস্ময়কর ইতিহাস, যা বারবার ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েও ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে জেগে উঠেছে। ভারতের জাতীয় অস্মিতা এবং সাংস্কৃতিক চেতনা কীভাবে শতবর্ষের অবদমন ও আক্রমণের পরেও অক্ষুণ্ণ থাকে, সোমনাথের কাহিনী তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


​সোমনাথ মন্দিরের আধ্যাত্মিক এবং পৌরাণিক ভিত্তি অত্যন্ত গভীর। গুজরাতের সমুদ্রতীরবর্তী প্রভাস পাটানে অবস্থিত এই মন্দিরটি হিন্দুধর্মের বারোটি পবিত্র জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে প্রথম এবং প্রধান বলে গণ্য করা হয়। স্কন্দপুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত গীতা এবং শিবপুরাণের মতো প্রাচীন গ্রন্থে এই মন্দিরের মহিমা বর্ণিত হয়েছে; এমনকি ঋগ্বেদেও এর পরোক্ষ উল্লেখ পাওয়া যায়।

ভৌগোলিকভাবে এই মন্দিরটি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত, যেখানে কপিলা, হিরণ এবং সরস্বতী— এই তিন পবিত্র নদীর সঙ্গম ঘটেছে এবং যা অবশেষে আরব সাগরে মিশেছে। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে, এই মন্দিরটি বিভিন্ন যুগে সোনা, রুপো, চন্দন কাঠ এবং পাথরের সমন্বয়ে বারবার নির্মিত হয়েছিল। লোকগাথা অনুযায়ী, চন্দ্রদেব বা সোমরাজ স্বয়ং এটি সোনা দিয়ে তৈরি করেছিলেন, পরবর্তীতে রাবণ রুপো দিয়ে এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এটি কাঠ দিয়ে নির্মাণ করেন। এই পৌরাণিক বিবর্তনটি আসলে সময়ের সাথে মন্দিরের বিরামহীন অস্তিত্বের একটি রূপক হিসেবে কাজ করে।

ঐতিহাসিকভাবে সোমনাথ মন্দির বারবার বিদেশি আক্রমণকারীদের লোলুপ দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ১০২৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মাহমুদ গজনভির লুণ্ঠন ও ধ্বংসলীলা এই মন্দিরের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। পারস্য পণ্ডিত আল-বিরুনির লেখায় এই আক্রমণের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৬ সালে গজনভির সেই প্রথম আক্রমণের ১০০০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে, যা বর্তমান সময়ে এই বিষয়টিকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

গজনভির পর ১২৯৭ সালে আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি অলঘ খান, ১৩৯৪ সালে জাফর খান এবং সবশেষে ১৭০৬ সালে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব এই মন্দিরটি ধ্বংসের নির্দেশ দেন। কিন্তু প্রতিটি ধ্বংসলীলার পরেই ভারতের স্থানীয় রাজারা, যেমন সোলাঙ্কি রাজবংশের রাজা ভীমদেব বা পরবর্তীতেকালে মালবের ভোজ পরমার, অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মন্দিরটিকে পুনর্নির্মাণ করেন। এই অবিরাম ধ্বংস ও সৃষ্টির চক্রটিই সোমনাথকে ‘অবিনশ্বর’ বা ‘অক্ষয়’ আখ্যা দিয়েছে।

​আধুনিক ভারতের ইতিহাসে সোমনাথের পুনর্জন্ম এক বিশেষ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বহন করে। ১৯৫১ সালে স্বাধীনতার পর ভারতের তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং কে এম মুন্সির তদারকিতে মন্দিরের বর্তমান কাঠামোটি গড়ে ওঠে। এই পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়াটি ছিল স্বাধীন ভারতের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। ১৯৫১ সালের ১১ মে যখন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ এই মন্দিরের প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তিনি একে ‘সংস্কৃতির বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। যদিও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির অংশগ্রহণের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন, তবুও ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ এবং সর্দার প্যাটেলের সংকল্প সোমনাথকে আধুনিক ভারতের এক অন্যতম জাতীয় প্রতীকে রূপান্তরিত করে।

​স্থাপত্যের বিচারে সোমনাথ মন্দিরটি ‘মারু-গুর্জরা’ বা ‘সোলাঙ্কি-চালুক্য’ শৈলীর এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এই স্থাপত্যশৈলীটি মূলত উত্তর ভারতের নাগারা স্কুল অফ আর্কিটেকচারের একটি বিশেষ উন্নত সংস্করণ, যা গুজরাত ও রাজস্থান অঞ্চলে বিকশিত হয়েছিল। মন্দিরের মূল কাঠামোটি ‘কৈলাস মহামেরু প্রসাদ’ বিন্যাসে নির্মিত, যার প্রধান শিখরটি প্রায় ৫০ মিটার উঁচু। এই শৈলীর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সূক্ষ্ম ও জটিল খোদাই কাজ এবং কাঠামোগত ভারসাম্য। মন্দিরের বাইরের দেয়ালে দেব-দেবী এবং নর্তকীদের মূর্তি খোদাই করা হয়েছে যা প্রাচীন ভারতীয় কারিগরদের দক্ষতার পরিচয় দেয়। এছাড়া এখানে ‘ঝরোকা’ (বারান্দা), ‘জালি’ (পাথরের কারুকাজ করা জানালা) এবং ‘ছত্রী’র মতো উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে যা মরু-গুর্জরা স্থাপত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সোমনাথের স্থাপত্যে প্রাচীন ভারতের বৈজ্ঞানিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অসাধারণ মেলবন্ধন দেখা যায়। মন্দিরটি এমনভাবে পূর্বমুখী করে তৈরি করা হয়েছে যে, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে অর্থাৎ বিষুবরেখার দিনগুলোতে সূর্যের প্রথম আলো সরাসরি মন্দিরের গর্ভগৃহে রাখা জ্যোতির্লিঙ্গের ওপর পড়ে। এটি প্রাচীন স্থপতিদের গাণিতিক সূক্ষ্মতার প্রমাণ দেয়। এছাড়াও, এই শৈলীতে জল সংরক্ষণের এক অনন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সাধারণত উত্তর ভারতীয় মন্দিরে জলাশয় দেখা যায় না, কিন্তু এখানে ‘সূর্য কুণ্ড’ নামক ধাপকুয়া এবং বাউলি বা জোহাদের উপস্থিতি দেখা যায় যা রাজস্থান ও গুজরাতের জলসংকটের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ প্রমাণ করে যে, সোমনাথ কেবল একটি উপাসনালয় ছিল না, বরং এটি ছিল একটি জ্ঞান ও বিজ্ঞানের কেন্দ্র।

সোমনাথ মন্দিরের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব কেবল হিন্দুধর্মের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ভারতের জাতীয় একতার প্রতীক। ১৮৯০-এর দশকে স্বামী বিবেকানন্দ যখন এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সোমনাথ দর্শন করেছিলেন, তখন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে সোমনাথের পুনরুত্থানই হলো ভারতের পুনরুত্থান। ভারতের বিশিষ্ট বীরাঙ্গনা ও ইন্দোরের রানি অহিল্যাবাই হোলকার রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেও এই মন্দিরের পূজা ও আচার-বিধি সচল রাখতে এবং এর সংস্কারে এক বিশাল ভূমিকা পালন করেছিলেন। জৈন আচার্য হেমচন্দ্রাচার্যও এই মন্দিরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। এই বৈচিত্র্যময় শ্রদ্ধা ও ভক্তিই সোমনাথকে একটি সার্বজনীন রূপ দান করেছে।

​পরিশেষে বলা যায়, সোমনাথ মন্দিরের গল্প আসলে ভারতেরই গল্প। এটি এমন একটি সভ্যতার প্রতীক যা ঝোড়ো হাওয়ায় বারবার আক্রান্ত হয়েছে কিন্তু কখনও নিভে যায়নি। প্রধানমন্ত্রীর ‘অমৃত পর্ব’ সফর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি জাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যই হলো তার মেরুদণ্ড। সোমনাথ মন্দির আমাদের শেখায় যে ধ্বংস ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সৃষ্টি ও বিশ্বাস চিরন্তন। মন্দিরের সমুদ্রতীরের সেই বিখ্যাত ‘বাণ স্তম্ভ’ যেমন দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত কোনও বাধা ছাড়াই সোজা পথ নির্দেশ করে, সোমনাথের ইতিহাসও ঠিক তেমনি কোনও বাধা ছাড়াই ভারতের গৌরবময় অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে এক অক্ষয় পথপ্রদর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এটি কেবল পাথরের তৈরি মন্দির নয়, এটি ভারতের জাতীয় সংকল্পের এক অবিনশ্বর দলিল।