বিশ্বজুড়ে সম্প্রতি পালিত হলো আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের দ্বাদশ বর্ষ। ২১ জুন— উত্তর গোলার্ধের দীর্ঘতম দিন— এখন কেবল একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার দিন নয়, বরং এটি পরিণত হয়েছে বিশ্বমানবের মিলনোৎসবে। যোগ আজ শুধু একটি প্রাচীন ভারতীয় অনুশীলন নয়, এটি এক বৈশ্বিক ভাষা, যা মানুষকে দেশ, সংস্কৃতি ও সীমারেখা অতিক্রম করে একসূত্রে বেঁধেছে।
কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেড রোডে অনুষ্ঠিত এবারের উদ্যাপন সেই বৈশ্বিক বার্তাকেই আরও জোরালো করে তুলেছে। এখানে হাজার হাজার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ দেখিয়েছে, যোগ এখন কেবল শরীরচর্চা নয়— এটি সামাজিক সংযোগের এক শক্তিশালী মাধ্যম। আজকের বিশ্বে, যেখানে বিভাজন ও দ্বন্দ্ব প্রায়শই সামনে আসে, সেখানে যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় ঐক্যের মূল্য।
এই বছরের থিম ছিল ‘সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগ’। এই ভাবনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আধুনিক জীবনে মানুষ যতই ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, ততই শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব বাড়ছে। যোগ সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার একটি সহজ এবং কার্যকর পথ। এটি শরীরকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি মনকে শান্ত করে, চিন্তাকে পরিষ্কার করে এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে।
যোগের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কোনো নির্দিষ্ট বয়সের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। একজন তরুণ যেমন এর মাধ্যমে শক্তি ও মনোযোগ বাড়াতে পারে, তেমনই একজন প্রবীণ মানুষ এর মাধ্যমে শরীরকে সচল ও মনকে প্রশান্ত রাখতে পারেন। ‘৪০ বছরে ২০ বছরের চেয়ে বেশি নমনীয় হওয়া’ কিংবা ‘৫০ বছরে ৩০-এর চেয়ে বেশি উদ্যমী হওয়া’— এই ভাবনা কেবল অনুপ্রেরণামূলক বাক্য নয়, বরং নিয়মিত যোগাভ্যাসের মাধ্যমে তা বাস্তবেও সম্ভব।
এই প্রসঙ্গে ভারতীয় দর্শনের মহান ব্যক্তিত্বদের চিন্তাধারাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগকে মানব পরিচয়ের মূল হিসেবে দেখেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ আত্মশক্তি ও মানবসেবার মধ্যে যোগের সেতুবন্ধন খুঁজে পেয়েছিলেন।
আবার শ্রীঅরবিন্দ মনে করতেন, সমগ্র জীবনই এক ধরনের যোগ— যেখানে প্রতিটি কাজ, প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি অনুভূতি আত্মউন্নয়নের পথে একটি ধাপ। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, যোগ কেবল শরীরচর্চা নয়; এটি জীবনের এক সামগ্রিক দর্শন।
বাংলার মাটিতেও যোগের ঐতিহ্য নতুন নয়। বহু দশক ধরে এখানে বিভিন্ন আশ্রম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে যোগচর্চা হয়ে আসছে। তাই আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের উদ্যাপন এই অঞ্চলের মানুষের কাছে একদিকে যেমন গর্বের, তেমনই এটি নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার একটি সুযোগ।
আজকের দিনে যোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ মানুষ ক্রমশ মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যোগ এক ধরনের আশ্রয়, যা মানুষকে নিজের ভিতরের শক্তির সঙ্গে পরিচয় করায়। এটি শেখায় ধৈর্য, সংযম এবং আত্মবিশ্বাস— যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই প্রয়োজনীয়।
যোগ আজ আর কেবল ভারতের নয়, এটি সমগ্র বিশ্বের সম্পদ। এটি এমন একটি চর্চা, যা কোনো বিভাজন তৈরি করে না, বরং সকলকে একত্রিত করে। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস সেই ঐক্যেরই প্রতীক। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে এই দিনটি আরও বেশি মানুষকে সুস্থ, সচেতন ও সংযুক্ত জীবনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।