আগুনের মাঝখানে

মধ্যপ্রাচ্য আবারও আগুনের মাঝখানে। কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই ইরানের উপর ইজরায়েল ও আমেরিকার যৌথ বোমাবর্ষণ এই অঞ্চলের অস্থিরতাকে এক লাফে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনও সামরিক অভিযান নয়। বরং এটি এমন এক সংকটের সূচনা, যার অভিঘাত শুধু তেহরান, তেল আভিভ বা ওয়াশিংটনের সীমানায় আটকে থাকবে না, তার ঢেউ আছড়ে পড়বে সমগ্র পশ্চিম এশিয়া এবং বিশ্ব অর্থনীতির উপর।

ইজরায়েল ও আমেরিকার এই আক্রমণ এমন সময়ে এল, যখন ওমানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কথাবার্তা চলছিল। আলোচনার টেবিলে যখন সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিত মিলছে, তখন হঠাৎ আকাশ থেকে নেমে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শুধু সামরিক আঘাতই হানে না, কূটনীতির ভিত্তিকেও নাড়িয়ে দেয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাকে ইরানের ‘হুমকি’ নির্মূলের পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যে যখন শোনা যায় ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে ‘অপসারণ’-এর ইঙ্গিত, তখন তা নিছক প্রতিরক্ষামূলক অভিযান থাকে না, বরং সরাসরি শাসনব্যবস্থা বদলের ডাক হয়ে ওঠে।

এই ভাষ্যকে তেহরান স্বাভাবিকভাবেই শত্রুতার ঘোষণাপত্র হিসেবে দেখেছে। তার জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নেমে এসেছে ইজরায়েলের শহরগুলিতে, আবার সেই সব আরব রাষ্ট্রেও, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ফলে সংঘাত এখন ত্রিপাক্ষিক সীমা ছাড়িয়ে বহু রাষ্ট্রকে টেনে এনেছে। ইরান যদি মনে করে তার রাষ্ট্রসত্তাই বিপদের মুখে, তবে তার প্রতিক্রিয়া আরও কঠোর হতে পারে, এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।


এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক সম্ভাবনা হলো হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি তেল এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি ইরান সেখানে খনন, অবরোধ বা সামরিক তৎপরতা বাড়ায়, তা হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়া অবশ্যম্ভাবী। তেল-আমদানিনির্ভর দেশগুলির মধ্যে ভারতের মতো অর্থনীতির উপর এর প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ— সবই একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ এই যুদ্ধ কেবল বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াই নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির স্নায়ুযুদ্ধও।

কূটনৈতিক দিক থেকেও প্রশ্ন কম নয়। ওমান জানিয়েছে, তেহরান নাকি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে রাজি হয়েছিল। যদি তা সত্যি হয়, তবে হামলার সিদ্ধান্ত আলোচনার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই আঘাত করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন। ভবিষ্যতে কোনও দেশ কি সহজে আলোচনার টেবিলে বসতে চাইবে, যদি তার মনে সন্দেহ থাকে যে কথাবার্তা চলাকালীনই বোমা পড়তে পারে?

এই প্রসঙ্গে আরেকটি রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠছে, তা হলো, ভারতের অবস্থান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।সম্প্রতি ইজরায়েল সফর শেষে ফিরেছেন। তাঁর সফরের ঠিক পরেই এই হামলা হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই কূটনৈতিক মহলে নানা জল্পনা। ভারত ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিম এশিয়ায় ‘কৌশলগত ভারসাম্য’-এর নীতি মেনে চলেছে— ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা যেমন রয়েছে, তেমনি প্যালেস্তাইন প্রশ্নেও নীতিগত সমর্থন বজায় রেখেছে। এখন এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে দিল্লিকে আরও সূক্ষ্ম কূটনৈতিক পথ বেছে নিতে হবে। কারণ একদিকে জ্বালানি-নির্ভরতা, অন্যদিকে প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা— দুটিই বড় প্রশ্ন।

আরও একটি বড় বিপদ হলো, আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তার। কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির আকাশসীমা বন্ধ হওয়ায় হাজার হাজার যাত্রী আটকে পড়েছেন। বেসামরিক পরিকাঠামো যখন যুদ্ধের অভিঘাতে বিপর্যস্ত হয়, তখন বোঝা যায় সংঘাত কতটা গভীরে পৌঁছেছে। সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হয়তো অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পারে, কিন্তু অনিশ্চয়তার যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়, তা প্রতিরোধ করা কঠিন।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই সংঘাতের নৈতিক ভিত্তি। আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদ বলছে, আত্মরক্ষার সীমা ছাড়া অন্য কোনও দেশের ওপর আগ্রাসী আক্রমণ বৈধ নয়। যদি আলোচনার পথ খোলা থাকে, তবে সামরিক আঘাত সেই পথকে অবরুদ্ধ করে। শক্তিধর রাষ্ট্রের হাতে সামরিক ক্ষমতা আছে বলেই তা প্রয়োগের নৈতিক অনুমতি মেলে না। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, শাসনব্যবস্থা বদলের বাহানা নিয়ে চালানো অভিযান শেষ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা ডেকে আনে। ইরাক থেকে লিবিয়া তার উদাহরণ।

এই মুহূর্তে প্রয়োজন সংযম ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতার। কিন্তু কে সেই ভূমিকা নেবে? ওমানের উদ্যোগ প্রশ্নের মুখে। রাষ্ট্রসঙ্ঘ কার্যত নীরব। ইউরোপ বিভক্ত। রাশিয়া ও চীন নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক হিসাব কষছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য যেন এক বহুমাত্রিক দাবার ছকে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি চালের পরিণতি সুদূরপ্রসারী।
যুদ্ধের ভাষা দ্রুত, উত্তেজনাপূর্ণ এবং তাৎক্ষণিক। কূটনীতির ভাষা ধীর, জটিল ও ধৈর্যসাপেক্ষ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনে দ্বিতীয়টিই। যদি এই মুহূর্তে কোনও পক্ষই পিছিয়ে আসতে না চায়, তবে আগুন ছড়াতে সময় লাগবে না। আর সেই আগুনের তাপে পুড়বে শুধু একটি দেশ বা একটি সরকার নয়, পুড়বে সমগ্র অঞ্চল, প্রভাবিত হবে বিশ্ব অর্থনীতি, আর বিপন্ন হবে অসংখ্য সাধারণ মানুষের জীবন।