মণিপুরে দীর্ঘদিনের সংঘাতের মধ্যে সামান্য কোনও ইতিবাচক ঘটনাকেও অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ, যেখানে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস গভীর, সেখানে একে অপরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিটি উদ্যোগই ভবিষ্যতের শান্তির ভিত তৈরি করতে পারে। সম্প্রতি কুকি-জো সম্প্রদায়ের দুই বিধায়ক কিমনেও হাওকিপ হ্যাংশিং এবং হাওখোলেট কিপগেন ইম্ফলে গিয়ে বিধানসভা অধিবেশনের প্রথম দিনে সরাসরি উপস্থিত থেকে সেই সম্ভাবনারই একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলেছেন।
২০২৩ সালে হিংসা শুরু হওয়ার পর মণিপুর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। পাহাড় এবং উপত্যকার মানুষের মধ্যে শুধু ভৌগোলিক দূরত্ব নয়, তৈরি হয়েছে গভীর মানসিক দূরত্বও। কুকি-জো এবং মেইতেই— দুই সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষই হিংসার শিকার হয়েছেন। বহু মানুষ ঘরছাড়া হয়ে এখনও ত্রাণশিবিরে দিন কাটাচ্ছেন। স্বাভাবিক জীবন, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সামাজিক যোগাযোগ— সবই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজনীতিও সেই বিভাজনের বাইরে থাকতে পারেনি। বিধায়কদের মধ্যেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ইম্ফল, যা রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র, কুকি-জো সম্প্রদায়ের বহু মানুষের কাছে আজ নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক। সেই কারণেই কুকি-জো-দের প্রভাবশালী সংগঠন কুকি ইনপি মণিপুর তাদের বিধায়কদের ইম্ফলে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশ অমান্য করে হ্যাংশিং ও কিপগেনের বিধানসভায় উপস্থিতি তাই নিছক রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি ছিল একটি ঝুঁকি নিয়ে অন্য পক্ষের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।
শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই ধরনের পদক্ষেপের গুরুত্ব অনেক। কারণ, সংঘাত যত দীর্ঘ হয়, ততই দুই পক্ষের মধ্যে এমন ধারণা শক্তিশালী হয় যে অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে কথা বলাই বিপজ্জনক বা অসম্ভব। সেই মানসিকতা ভাঙা ছাড়া কোনও স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অস্ত্রের জোরে সাময়িক নীরবতা তৈরি করা যায়, কিন্তু মানুষের মনে জমে থাকা ভয় ও অবিশ্বাস দূর করা যায় না।
দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। বর্ণবৈষম্যের দীর্ঘ ইতিহাসের পর নেলসন ম্যান্ডেলা প্রতিশোধের পরিবর্তে সত্য ও পুনর্মিলনের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করা, যেখানে পরবর্তী প্রজন্ম আর অতীতের হিংসা পুনরাবৃত্তি করবে না। মণিপুরের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য হওয়া উচিত একই— অতীতকে ভুলে যাওয়া নয়, বরং সত্যকে স্বীকার করে এমন একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ‘আর কখনও নয়’ কথাটি বাস্তব অর্থ পায়।
অবশ্য দুই বিধায়কের ইম্ফল সফরকে অতিরিক্ত আশাবাদের কারণ হিসাবেও দেখা উচিত নয়। মণিপুরের সংকট অত্যন্ত গভীর। পাহাড় ও উপত্যকার মধ্যে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় লাগবে। শুধু সরকারের উদ্যোগে তা সম্ভব নয়। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সামাজিক নেতা, নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-যুবসমাজ এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিকেও এগিয়ে আসতে হবে। দুঃখের বিষয়, এত দিন বহু বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীও নিরপেক্ষ সেতুর ভূমিকা নেওয়ার পরিবর্তে কোনও না কোনও পক্ষের অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। এই প্রবণতা বদলানো জরুরি।
এখন কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের দায়িত্ব আরও বেশি। হ্যাংশিং ও কিপগেনের এই ছোট পদক্ষেপকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁদের মতো আরও জনপ্রতিনিধিদের নিরাপদে মুখোমুখি আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিক যোগাযোগ, নাগরিক সংলাপ এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরির প্রক্রিয়াকে সরকারকে সক্রিয় ভাবে উৎসাহিত করতে হবে।
শান্তির পথ কখনও এক লাফে তৈরি হয় না। কখনও কখনও তার শুরু হয় মাত্র দু’জন মানুষের বিপরীত দিকে না গিয়ে একে অপরের দিকে এগিয়ে যাওয়া দিয়ে। মণিপুরের দুই বিধায়কের ইম্ফল যাত্রা সেই অর্থে একটি ছোট পদক্ষেপ। কিন্তু এই ছোট পদক্ষেপ যদি সংলাপের পথ খুলে দেয়, তবে তার গুরুত্ব অনেক বড়। মণিপুরের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন একদিন বলতে পারে— সেই ভয়াবহ দিনগুলি আর কখনও ফিরে আসবে না— সেটিই হওয়া উচিত এখন সবার লক্ষ্য।