সেলুলয়েডের সততা ও রাজনৈতিক অসময়ের কিছু প্রশ্ন

সুনীল মাইতি

শিল্পীর মৃত্যু কেবল একটা শরীরী অবসান নয়; অনেক সময় তা একটি সময়ের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। পরিচালক অনীক দত্তের অকাল ও আকস্মিক প্রস্থান বাংলা সংস্কৃতি জগৎকে যেমন স্তব্ধ করেছে; তেমনই পর্দার পেছনের কিছু চেনা অস্বস্তি ও রাজনৈতিক চোরা চোরাস্রোতকে আবার সমক্ষে এনে ফেলেছে। অনীক দত্ত কেবল একজন প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এই সময়ের অন্যতম এক সোচ্চার; আপোষহীন কণ্ঠস্বর। তাঁর চলে যাওয়ার সমান্তরালে যে প্রশ্নগুলো দানা বাঁধছে; তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এ রাজ্যের বর্তমান শিল্প -রাজনীতি ও মুক্তচিন্তার এক জটিল রসায়ন।
অনীক দত্তের চলচ্চিত্র জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়; তাঁর প্রথম ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যত’ দিয়েই তিনি বাঙালি দর্শকের মন জয় করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সিনেমা কেবলই নিখাদ বিনোদন ছিল না; হাসির মোড়কে তা ছিল তীব্র এক সামাজিক ও রাজনৈতিক বিদ্রুপ (Satire)। ক্ষমতার দম্ভ; কর্পোরেট আগ্রাসন আর বাম-ডান নির্বিশেষে রাজনৈতিক ভন্ডামীকে তিনি যেভাবে সেলুলয়েডে বিঁধেছিলেন; তা অনেক ‘পাওয়ার করিডোর’ (Power-Corridor)-এ অস্বস্তির কারণ হয়েছিল। পরবর্তীকালে ‘ভবিষ্যতের ভূত’ ছবিটির মুক্তির পর যেভাবে প্রেক্ষাগৃহ থেকে তা তুলে নেওয়া হয়েছিল; তা পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। কোনও আইনি নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই; স্রেফ ‘অদৃশ্য’ নির্দেশে একটি ছবিকে হল থেকে গায়েব করে দেওয়ার ঘটনা আমাদের রাজ্যের তথাকথিত মুক্তমনস্কতার মুখোশটি খুলে দিয়েছিল। অনীক দত্ত সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই লড়েছিলেন এবং সুপ্রিম কোর্টে জয়ী হয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে; শিল্পের স্বাধীনতাকে ক্ষমতার জোরে চিরতরে চেপে রাখা যায় না।
তাঁর এই আপোষহীন মনোভাবই তাঁকে সমসাময়িক অনেকর চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল। যখন টলিউডের একটা বড় অংশ ক্ষমতার অলিন্দে জায়গা পাওয়ার জন্য; পুরস্কার বা সরকারি কমিটির সদস্য পদের লোভে বশ্যতা স্বীকার করতে ব্যস্ত; তখন অনীক দত্ত ছিলেন ব্যতিক্রমী। তিনি কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অন্ধ ক্যাডার ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একজন খাঁটি বামপন্থী চেতনার মানুষ— যিনি চিরকাল শোষিত ও শাসকের ক্ষমতার অপব্যবহার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।
এই ‘স্পষ্টবাদিতা’র চড়া মূল্য ও তাঁকে চোকাতে হয়েছে। প্রযোজক না পাওয়া; হল বণ্টনের রাজনীতিতে কোণঠাসা হওয়া বা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হওয়া— এ সবই ছিল তাঁর নিত্য সঙ্গী।
তাঁর এই আচমকা মৃত্যুর পর স্বভাবতই কিছু প্রশ্ন উঠছে। একজন সংবেদনশীল শিল্পীকে যেভাবে প্রতিনিয়ত নিজের সৃষ্টিকে বাঁচানোর জন্য ব্যবস্থার (System) বিরুদ্ধে লড়াই করতে হতো; তা কি তাঁর মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলেনি? সৃজনশীল মানুষেরা তো আর পাঁচটা মানুষের মতো নন; তাঁদের মনন অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়। দিনের পর দিন প্রান্তিক করে রাখার এই যে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি; তা কি পরোক্ষভাবে একজন শিল্পীর জীবনী শক্তিকে শুষে নেয় না?
এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে টলিউডের বর্তমান রাজনৈতিক চালচিত্র। আজ বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ স্পষ্টতই দুটি শিবিরে বিভক্ত– একদল ক্ষমতার চাটুকারিতায় মগ্ন; অন্য দল ভয়ে কুঁকড়ে থাকা নীরব দর্শক। অনীক দত্ত এই দুই শিবিরের বাইরে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করার সাহস দেখাতেন। তাঁর অনুপস্থিতি এখন সেই ক্ষমতার পূজারীদের জন্য কিছুটা স্বস্তি হতে পারে; কিন্তু স্বাধীন চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। সরকারি উৎসবের আলো আর লাল গালিচার চাকচিক্য দিয়ে যে সংস্কৃতির বিকাশ হয় না; তা অনীক দত্ত তাঁর ‘অপরাজিত’ ছবি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের শতবর্ষে দাঁড়িয়ে কোনও সরকারি সাহায্য ছাড়াই তিনি যে কালজয়ী সৃষ্টি উপহার দিয়েছিলেন; তা ক্ষমতার দম্ভের মুখে এক সপাটে চড় ছিল।
অনীক দত্তের মৃত্যু আমাদের এক গভীর আত্মদর্শনের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। আমরা কি এমন এক সমাজ তৈরি করছি যেখানে কেবল মেরুদণ্ডহীন তোষামোদকারীরাই পুরস্কৃত হবে? আর যাঁরা সত্য বলবেন; ক্ষমতার ভুল ত্রুটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবেন; তাঁদেরকে প্রতিনিয়ত কোণঠাসা হয়ে মরতে হবে? অনীক দত্ত চলে গেছেন; কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজ ও আপামর দর্শকের বিবেককে তাড়া করে বেড়াবে।
শিল্পীর কোনও দল হয় না; তাঁর একমাত্র পরিচয় তাঁর সততা। অনীক দত্ত সেই সততার শেষ প্রতীকদের একজন ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর দলীয় রাজনীতির কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি হয়তো চলবে; কিন্তু আসল সত্যিটা হলো— বাংলা সিনেমা একজন নির্ভীক স্রষ্টাকে হারালো।
এখন প্রশ্ন একটাই— আগামী দিনে টলিউডের আর কোনও অনীক দত্ত মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস পাবেন কি; নাকি ক্ষমতার অন্ধ গলিতে হারিয়ে যাবে, আগামীর সব ‘ভবিষ্যতের ভূত’? উত্তরটা সময়ের গর্ভে; তবে লড়াইয়ের যে প্রচেষ্টা তিনি পাকিয়ে দিয়ে গেছেন; তা নেভানো সহজ হবে না।