আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নীতি ও নৈতিকতার কথা যতই বলা হোক, বড় শক্তিগুলি শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য ভারত ও চিনের উপর চড়া শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়েও আমেরিকা যদি নিজেই রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কেনে, তবে তার চেয়ে বড় দ্বিচারিতার উদাহরণ আর কী হতে পারে! ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত শুধু আমেরিকার ঘোষিত নীতির অসারতাই প্রমাণ করে না, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই রাশিয়ার জ্বালানি কেনা নিয়ে আমেরিকা বিভিন্ন দেশের উপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে। ভারতের ক্ষেত্রেও সেই চাপ কম ছিল না। অথচ এখন নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ও জ্বালানির বাজার সামলাতে আমেরিকা রাশিয়ার ডিজেল কিনতে রাজি হয়েছে। অর্থাৎ নিজের স্বার্থে যে কাজ আমেরিকার পক্ষে গ্রহণযোগ্য, অন্য দেশ একই কাজ করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ! এই মনোভাব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সুস্থ পরিবেশের পরিপন্থী।
ট্রাম্পের এই আচরণের পিছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপও কাজ করছে বলে মনে হয়। আমেরিকায় পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মানুষের অসন্তোষ যে কোনও সরকারের পক্ষেই উদ্বেগের কারণ। বিশেষত নির্বাচনের আগে এই অসন্তোষ শাসক দলের রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ায়। ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং তার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। কিন্তু নিজের নীতির ব্যর্থতা স্বীকার করার পরিবর্তে অন্যের উপর দোষ চাপানো রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে দায়ী করার প্রবণতার মধ্যে সেই কৌশলই
দেখা যাচ্ছে।
অবশ্য রাশিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামোর উপর ইউক্রেনের আক্রমণের প্রভাব একেবারে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বাধা বড় ভূমিকা পালন করছে। জটিল আন্তর্জাতিক সংকটের জন্য একটিমাত্র দেশ বা নেতাকে দায়ী করলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়ালেই থেকে যায়। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ভারত কতটা দৃঢ় থাকতে পারবে। ভারতের বিপুল জনসংখ্যা, শিল্প, পরিবহণ এবং কৃষি— সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির চাহিদা অত্যন্ত বেশি। তাই যে দেশ থেকে কম দামে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে তেল পাওয়া যায়, সেখান থেকে আমদানি করার সিদ্ধান্ত ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। কোনও বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক পছন্দের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপানো যুক্তিসংগত নয়।
চিনের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যিক সংঘাতের অভিজ্ঞতাও ভারতের কাছে শিক্ষণীয়। পাল্টা শুল্কের লড়াইয়ে মার্কিন অর্থনীতির উপর চাপ বাড়লে ট্রাম্প প্রশাসনকে অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আসতে হয়েছে। এতে বোঝা যায়, দৃঢ় অবস্থান এবং আলোচনার ক্ষমতা বড় শক্তিকেও তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। অন্যদিকে, শুধু চাপের মুখে ছাড় দিতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও চাপ আসার আশঙ্কা থাকে।
তবে ভারতের উচিত হবে না আবেগের বশে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা। আমেরিকা ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদার। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ একতরফা আনুগত্য নয়। পারস্পরিক সম্মান, সমান অধিকার এবং স্বার্থের ভারসাম্যের ভিত্তিতেই প্রকৃত অংশীদারত্ব গড়ে ওঠে।
ভারতের বিদেশনীতি তাই হওয়া উচিত স্বাধীন, বাস্তববাদী এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। রাশিয়া, আমেরিকা কিংবা অন্য কোনও দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভারতের সিদ্ধান্ত ভারতকেই নিতে হবে। অন্যের হুমকিতে নীতি বদল নয়, যুক্তি ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণই হওয়া উচিত দিল্লির পথ।