বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (এসআইআর) শেষ পর্যায়ে। বিভিন্ন রাজ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, আর পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরপ্রদেশে তা প্রকাশের অপেক্ষায়। কিন্তু সামগ্রিক পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি। এখানে এসআইআর প্রয়োগের পদ্ধতি, তার বাস্তবায়ন এবং তার ফলাফল, সব মিলিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার ছবি সামনে এসেছে।
অন্য কয়েকটি রাজ্যে যেমন তামিলনাড়ু, গুজরাত বা ছত্তিসগড়ে বড় সংখ্যায় ভোটারের নাম বাদ পড়ার খবর এসেছে, তেমনই পশ্চিমবঙ্গেও অভিযোগের স্রোত কম নয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সমস্যার চরিত্র আলাদা। এখানে বাদ পড়ার সম্ভাবনা, নামের বানানগত অমিল, ঠিকানা পরিবর্তন, স্থানীয় ভাষাগত ভিন্নতা— এসবকে কেন্দ্র করে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা এক কথায় অভূতপূর্ব। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ভোটারদের কাছ থেকে পুনরায় নথি চাওয়া হয়েছে, অথচ প্রশাসনিক স্তরে সমন্বয় ও স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল প্রকট।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এর দায়ভার কার? এসআইআর এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে নির্বাচন কমিশন মূলত নাগরিকের উপর প্রমাণের দায় চাপিয়েছে। অর্থাৎ, ভোটারকেই দেখাতে হবে তিনি বৈধ। কিন্তু সংবিধান যে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা দেয়, তার চেতনা কি এই পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রের, নাগরিকের নয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাইয়ের পরিবর্তে যদি দ্রুত ও কাগজনির্ভর প্রক্রিয়া নেওয়া হয়, তবে ভুল হওয়ার আশঙ্কা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে।
পশ্চিমবঙ্গে সমস্যাটি আরও তীব্র হয়েছে কারণ এখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মসূত্রে অন্যত্র যান, আবার অনেকে সাময়িকভাবে গ্রাম থেকে শহরে বা শহর থেকে গ্রামে স্থানান্তরিত হন। বিয়ের পর মহিলাদের ঠিকানা বদলানো একটি সামাজিক বাস্তবতা। এই চলমান জনসংখ্যাকে ধরে রাখতে বিশেষ সংবেদনশীলতার প্রয়োজন ছিল। অভিযোগ উঠেছে, সেই সংবেদনশীলতা দেখা যায়নি। বরং নামের সামান্য অমিল বা নথির ক্ষুদ্র ত্রুটিকে কেন্দ্র করে বহু মানুষকে সংশোধন ও দাবি প্রক্রিয়ার জটিল পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর বাস্তবায়িত করতে গিয়ে যে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ উঠেছে, তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আদালতকে এর আইনি যাচাইয়ের জন্য কেবল রাজ্যের বিচারকর্মী নয়, পার্শ্ববর্তী রাজ্যের কর্মকর্তাদের সহায়তাও নিতে হয়েছে। এটি নিছক প্রশাসনিক সহায়তা নয়, এটি আস্থাহীনতার প্রতিফলন। যখন একটি নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নির্ভুল বলে বিশ্বাসযোগ্য থাকে না, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়। আরও একটি প্রেক্ষাপট মনে রাখা জরুরি। সর্বশেষ জনগণনার তথ্য ২০১১ সালের। এরপর এক দশকের বেশি সময় কেটে গেছে। জনসংখ্যার গঠন, অভিবাসন, নগরায়ন— সবকিছু বদলেছে। এই বাস্তবতার সঙ্গে তাল না মিলিয়ে যদি পুরনো তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে ব্যাপক সংশোধন চালানো হয়, তবে চূড়ান্ত তালিকায় প্রকৃত প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার তুলনায় ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অবাক হবার কিছু নেই। পশ্চিমবঙ্গের মতো উচ্চ জনঘনত্ব ও অভিবাসনপ্রবণ রাজ্যে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা নিয়ে যে যুক্তি দেওয়া হয়— অভিযোগ কম এসেছে— তাতে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। রাজনৈতিক দলগুলি প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনীতিতে ব্যস্ত। প্রত্যেক সম্ভাব্য বাদ পড়া ভোটারের খোঁজ রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। উপরন্তু, ভোটার কার্ড এমন কোনও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় নথি নয়, যা মানুষ নিয়মিত ব্যবহার করেন। ফলে অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে, তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, যতক্ষণ না ভোটের দিন আসে। এই অবস্থায় প্রয়োজন স্পষ্ট ও দ্রুত বিচারবিভাগীয় সিদ্ধান্ত।
এসআইআর প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা, তার পদ্ধতি এবং নাগরিকের উপর আরোপিত প্রমাণের বোঝা— সবই নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। আদালতের ভূমিকা কেবল ক্ষত সারানো নয়; ভবিষ্যতের জন্য নীতি নির্ধারণও। যদি প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত ত্রুটি থাকে, তবে তা চিহ্নিত করে সংশোধনের নির্দেশ দেওয়াই হবে গণতন্ত্রের প্রতি প্রকৃত দায়বদ্ধতা।
পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিচ্ছে— ভোটার তালিকা কেবল প্রশাসনিক নথি নয়, এটি নাগরিকের অধিকারপত্র। সেখানে যদি অনিশ্চয়তা, বিশৃঙ্খলা বা অবিশ্বাস ঢুকে পড়ে, তবে নির্বাচনের দিন যত শান্তিপূর্ণই হোক না কেন, গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়। তাই এসআইআর নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা দ্রুত ও স্পষ্টভাবে মীমাংসা করা এখন সময়ের দাবি। সর্বজনীন ভোটাধিকার কেবল সংবিধানের পাতায় নয়, বাস্তবের মাটিতেও অক্ষুণ্ণ থাকুক, এই প্রত্যাশাই আজ সবচেয়ে বড়।