আমি গর্বিত, আমি কৃষক: প্রশিক্ষণ মানে শুধু সংখ্যা নয়, চাই গুণগত রূপান্তর

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

তপনকুমার মাইতি

মাঠের ধুলোমাখা শরীর আর কপালে ঘামের রেখা নিয়ে যখন একজন মানুষ প্রকৃত অর্থেই মাথা উঁচু করে বলতে পারেন— ‘আমি গর্বিত, আমি একজন কৃষক’, তখনই বোঝা যায় কৃষির প্রকৃত উন্নয়ন শুরু হয়েছে। কৃষকের এই আত্মমর্যাদাই গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি। কিন্তু এই গর্ব আর আত্মবিশ্বাস তখনই স্থায়ী হয়, যখন কৃষক প্রযুক্তিতে দক্ষ, জ্ঞানে সমৃদ্ধ এবং সিদ্ধান্তে স্বাধীন হন। আমাদের সরকারি-বেসরকারি কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচির একটি বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে প্রশিক্ষণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যে হাজার হাজার প্রশিক্ষণ শিবির হচ্ছে, তা কি কৃষকের এই গর্বকে শক্ত ভিত্তি দিতে পারছে? নাকি তা কেবল নথিপত্রের খতিয়ান আর সংখ্যার খেলাতেই সীমাবদ্ধ?বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ কৃষি প্রশিক্ষণ এখনো গতানুগতিক লেকচারনির্ভর ও সেমিনারকক্ষকেন্দ্রিক। প্রশিক্ষণের সফলতা মাপা হয় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আর ব্যয়ের অঙ্ক দিয়ে, কিন্তু মাপা হয় না ‘লার্নিং আউটকাম’ বা শেখার ফলাফল দিয়ে। দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের শেখার নীতি বা ‘অ্যাডাল্ট লার্নিং প্রিন্সিপল’ (Andragogy) অনুসরণ না করলে কৃষকের আচরণে পরিবর্তন আনা অসম্ভব। মানুষ তখনই শেখে, যখন বিষয়টি তার জীবনের সরাসরি কোনো সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকে। কৃষক সবচেয়ে ভালো শেখে হাতে-কলমে প্রয়োগের মাধ্যমে। আর পরিবর্তন আসে তখনই, যখন সে বুঝতে পারে নতুন পদ্ধতিতে তার আর্থিক লাভ বাড়বে এবং ঝুঁকি কমবে।বর্তমানে আমাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় কৃষককে কেবল তথ্যের স্তূপ দেওয়া হয়, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করা হয় না। ফলে কৃষক ক্রমশ ‘ডিলারনির্ভর’ হয়ে উঠছে। মাটির প্রকৃত প্রয়োজন বা নিজের বিশ্লেষণের চেয়ে কোম্পানির ‘সেলস টার্গেট’ তার কৃষি-সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করছে। এই ব্যবস্থার কারণেই শিক্ষিত যুবসমাজ কৃষিকে একটি অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে দেখছে। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা কৃষিকে একটি পরিকল্পিত ব্যবসা বা আধুনিক উদ্যোক্তা কার্যক্রম হিসেবে তরুণদের সামনে তুলে ধরতে পারছে না।তাই এখন সময় এসেছে কৃষি প্রশিক্ষণের লক্ষ্য ও কাঠামো আমূল পুনর্গঠন করার। প্রশিক্ষণকে আর বিচ্ছিন্ন কোনো ‘ইভেন্ট হিসেবে দেখলে চলবে না; একে দেখতে হবে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে। এর জন্য প্রয়োজন:
১. প্রশিক্ষণ নকশার আধুনিকায়ন: বিষয়বস্তু হতে হবে কৃষকের বাস্তব সমস্যা সমাধানে সহায়ক এবং মাঠে প্রয়োগযোগ্য।

২. দক্ষ প্রশিক্ষক ও ‘ওয়ার্ম লিসেনিং’ : প্রশিক্ষককে কৃষকের ভাষায় কথা বলতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে একজন কৃষকের জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা অনেক বেশি সমৃদ্ধ। প্রশিক্ষকদের উচিত কৃষকদের সেই বলিষ্ঠ ধুলোমাখা পায়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনা।


৩.আবাসিক শিবির: একদিনের বিচ্ছিন্ন সেমিনারের বদলে কমপক্ষে দু’দিনের আবাসিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, যেখানে কৃষক ও প্রশিক্ষকের মধ্যে নিবিড় অভিজ্ঞতা বিনিময় সম্ভব।

৪. কৃষক থেকে উদ্যোক্তা: কৃষককে খরচ-লাভ বিশ্লেষণ, বাজার ব্যবস্থা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শেখাতে হবে। তবেই কৃষি শুধু বেঁচে থাকার লড়াই না হয়ে একটি লাভজনক পেশায় রূপ নেবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের অন্নদাতাদের অদম্য মেধা আর ঘামঝরা শ্রমের কোনো অভাব নেই; অভাব শুধু সঠিক দিশা আর গুণগত প্রশিক্ষণের। প্রখ্যাত বাউল সাধক লালন ফকিরের ভাষায় বলতে হয়— ‘এমন মানব জমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা।’

আমাদের এই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের যদি আমরা সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে আধুনিক জ্ঞানে ও সঠিক সহমর্মিতায় ‘আবাদ’ করতে পারি, তবেই বাংলার মাঠে মাঠে প্রকৃত সোনা ফলবে। আমাদের আরও মনে রাখা প্রয়োজন, পুঁথিগত প্রশিক্ষণের চেয়ে কৃষকদের জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অনেক বেশি সমৃদ্ধ। তাই প্রশিক্ষকদের প্রয়োজন কৃষকদের ওই মাঠ ও মাটি সম্পর্কিত গভীর অভিজ্ঞতার পাঠ গ্রহণ করা। প্রশিক্ষণ মানে আর শুধু ‘একদিনের সেমিনার’ নয়; প্রশিক্ষণ মানে হলো শেখার বাস্তব প্রমাণ এবং মাঠে তার সফল প্রতিফলন। পরিবেশবান্ধব আধুনিক কৃষির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা আজ কৃষককে কীভাবে সমৃদ্ধ করছি এবং তাঁদের ওপর কতটা আস্থা রাখছি— ঠিক তার ওপরই।