পশ্চিম এশিয়ার জলপথে তেলবাহী জাহাজের ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকি এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলির বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরানকে কেন্দ্র করে বর্তমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এই পরিস্থিতি এখন সবচেয়ে সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগর— এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিরাপত্তাহীনতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালী দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু ইরান এই প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আগে যেখানে প্রতিদিন শতাধিক জাহাজ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত, এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে একেবারে হাতেগোনা কয়েকটিতে। অনেক জাহাজ আবার নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে চলাচল করছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
এই অবস্থায় কিছু জাহাজ বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগরের রুট ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু সেখানেও নতুন করে বিপদ দেখা দিয়েছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের জাহাজ লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। তারা এমনকি সৌদি বন্দরের বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণাও করেছে। ফলে যে পথটি কিছুটা স্বস্তি দিতে পারত, সেটিও এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ, সমস্যার ওপর সমস্যা তৈরি হয়েছে— যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।
এই সংকট শুধু একটি অঞ্চলের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়, এর প্রভাব পড়ছে গোটা বিশ্বে। তেল সরবরাহ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনায় তেলের দাম কিছুটা কমেছে, তবুও পরিস্থিতি স্থিতিশীল নয়। বাজারে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে, যা বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই সংকট আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যবস্থার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। জাহাজ মালিকদের সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে যে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। উচ্চ ঝুঁকির এলাকা এখন শুধু হরমুজ প্রণালীতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সৌদি আরবের উপকূল ও লোহিত সাগরের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়েও ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে বীমা খরচ বাড়ছে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল— সমাধান কোথায়? ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার ইঙ্গিত কিছুটা আশার সঞ্চার করলেও বাস্তবে কোনও দ্রুত সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসন’ চলতে থাকলে তারা কোনও চুক্তিতে পৌঁছবে না। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও কঠোর। ফলে আলোচনার পথ সহজ নয়।
এক্ষেত্রে ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে শুধু আংশিক আলোচনা নয়, একটি কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সব পক্ষের আন্তরিকতা প্রয়োজন। নইলে বর্তমান পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে।
পশ্চিম এশিয়ার এই সামুদ্রিক সংকট আমাদের আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বিশ্ব অর্থনীতি কতটা পরস্পরনির্ভরশীল। একটি অঞ্চলের অস্থিরতা কীভাবে গোটা বিশ্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তারই বাস্তব উদাহরণ এটি। তাই এই সংকটের দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এখন বিশেষ জরুরি। নাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, সামগ্রিক আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।
হরমুজ : আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
Photo: Statesman