গৃহিনীদের শ্রম

ভারতের অর্থনীতি ও সমাজে এক অদৃশ্য শ্রমের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে— যে শ্রমের কোনও বেতন নেই, কোনও স্বীকৃতি নেই, অথচ যার উপর দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের দৈনন্দিন জীবন। এই শ্রমের প্রধান বাহক হলেন ‘গৃহিণী’ বা ‘হোমমেকার’রা। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এই অদৃশ্য শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করতে গিয়ে মাসে ৩০ হাজার টাকা হিসেবে বিবেচনা করেছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি আইনি রায় নয়, বরং সামাজিক স্বীকৃতির পথে একটি বড় পদক্ষেপ।
আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে গৃহস্থালির কাজকে ‘স্বাভাবিক দায়িত্ব’ হিসেবে দেখা হয়েছে, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে। রান্না করা, সন্তান লালন-পালন, বৃদ্ধদের দেখাশোনা, ঘর পরিষ্কার রাখা— এই সমস্ত কাজকে কখনোই অর্থনৈতিক কাজ হিসেবে ধরা হয়নি। অথচ এই কাজগুলির প্রতিটিরই বাজারমূল্য রয়েছে। যদি এই কাজগুলির জন্য আলাদা আলাদা মানুষ নিয়োগ করা হয়, তাহলে খরচ কত দাঁড়াবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
পরিসংখ্যানও এই বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট করে। টাইম ইউজ সার্ভে দেখিয়েছে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি সময় ব্যয় করেন গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজে। এর ফলে তাঁরা বাইরে গিয়ে কাজ করার সুযোগ কম পান। ফলে শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ কম থাকে। পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, যেখানে পুরুষদের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ করছেন বা কাজ খুঁজছেন, সেখানে নারীদের হার মাত্র ৩০ শতাংশের একটু বেশি।
এই বৈষম্যের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করে। যখন অর্ধেক জনসংখ্যা পুরোপুরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারে না, তখন দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কমে যায়। অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, যেখানে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি, সেখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতিও তুলনামূলকভাবে দ্রুত।
এই সমস্যার মূল কারণ দুটি স্তরে রয়েছে। প্রথমত, আমাদের সামাজিক মানসিকতা। এখনও অনেক পরিবারে মনে করা হয়, গৃহস্থালির কাজ নারীদের দায়িত্ব, আর উপার্জন করা পুরুষদের কাজ। এই ধারণা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। ফলে মেয়েরা ছোটবেলা থেকেই এমন একটি মানসিক কাঠামোর মধ্যে বড় হয়, যেখানে তাদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা আগে থেকেই নির্ধারিত।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক কর্মক্ষেত্রের প্রকৃতিও সমস্যাকে জটিল করে তুলছে। আজকের অনেক চাকরিতে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়, অনিয়মিত সময়সূচি থাকে, এবং ব্যক্তিগত জীবনের জন্য খুব কম সময় থাকে। এই ধরনের কাজ নারীদের জন্য বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং, কারণ তাদের উপর বাড়ির দায়িত্বও থাকে। ফলে অনেক নারী বিয়ের পর বা সন্তান হওয়ার পর কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে শুধু আইনি স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়। সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। পরিবারে কাজের দায়িত্ব সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া দরকার। পুরুষদেরও গৃহস্থালির কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলিকে কর্মক্ষেত্রে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে নারীরা সহজে কাজ ও পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারেন। যেমন— ফ্লেক্সিবল কাজের সময়, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, সাশ্রয়ী শিশু-পরিচর্যা কেন্দ্র ইত্যাদি।
এছাড়াও, নীতিনির্ধারকদের উচিত এই অদৃশ্য শ্রমকে অর্থনীতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। গৃহস্থালির কাজকে যদি জাতীয় আয়ের হিসাবের মধ্যে আনা যায়, তাহলে এর প্রকৃত মূল্য আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসবে। এতে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে সাহায্য করবে।
বর্তমানে কিছু রাজনৈতিক উদ্যোগ দেখা যায়, যেখানে নারীদের সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য সামান্য আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়। কিন্তু এই ধরনের পদক্ষেপ সমস্যার মূল কারণকে স্পর্শ করে না। বরং প্রয়োজন নারীদের প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, যাতে তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারেন।
সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায় আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়— গৃহস্থালির কাজ কোনও তুচ্ছ বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক মূল্য বহন করে। এই উপলব্ধিকে সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে দিতে পারলেই প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব। কারণ, একটি দেশের উন্নতি তখনই সম্ভব, যখন তার প্রতিটি নাগরিকের শ্রমের মূল্য সমানভাবে স্বীকৃত হয়।