ধীমান হালদার
উনিশ শতকের সূচনায় বাংলায় নবজাগরণের অগ্রদূত হিসেবে সূর্যের মতন আবির্ভাব হয়েছিল রামমোহন রায়ের। আর এই সূর্যের চারিদিকে প্রবহমান জ্যোতিষ্কগুলির মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন ডিরোজিও। ১৮০৯ সালের ১৮ এপ্রিল ডিরোজিও জন্মগ্রহণ করেছিলেন কলকাতার এক পর্তুগীজ ফিরিঙ্গি পরিবারে। ডিরোজিওর পিতা ছিলেন ‘জে স্কট অ্যান্ড কোং’ নামে কলকাতার এক বিখ্যাত সদাগরি আপিসের উচ্চপদস্থ চাকুরে। থাকতেন এন্টালির কাছে। ছয় বছর বয়সে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন ধর্মতলা অ্যাকাডেমিতে। তাঁর শিক্ষক ছিলেন ডেভিড ড্রামণ্ড। এই ড্রামন্ড সাহেব ছিলেন ঘোর সংশয়বাদী এবং যুক্তিপন্থী। জীবনের সবটুকুই তিনি সম্পূর্ণরূপে উপভোগ করতে চেয়েছিলেন। তাই বাড়িতে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে পানাহার কিংবা নাচগান করতে একটুও সামাজিক সংকোচবোধ করতেন না। মনে করতেন রুচি বিকৃত না করে আত্মবিকাশের জন্য মানুষের সব কিছু করার স্বাধিকার রয়েছে। ঈশ্বর কেউ থেকে থাকলে থাকুন, কেউ অফুরন্ত অবসর যাপনের ইচ্ছেতে ঈশ্বরের খোঁজে লিপ্ত থাকতে চাইলে থাকুন, কিন্তু তাঁর মতে ইহজীবনে মানুষই ঈশ্বর। মানুষই তাঁর সর্বময় প্রভু এবং মানবচিন্তাই ঈশ্বরচিন্তার নামান্তর। ড্রামন্ড সাহেবের এই চারিত্রিক বলিষ্ঠতাই জীবন-দর্শন হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছিল ডিরোজিওর মনে প্রাণে।
ড্রামন্ডের স্কুলের পাঠ শেষ করে পিতার আপিসে কেরানির কাজে যোগ দেন ডিরোজিও। বছর দুই সেই কাজ করেন বটে। তবে চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দী থেকে কোন তরুণের আর কলমপেশার কাজ মনে ধরে! চাকরি ছেড়ে চলে গেলেন ভাগলপুরে মাসিমার বাড়ি। সেখানে তাঁর মেসোমশাই জনসন সাহেব নীলকুঠির মালিক। নীল ব্যবসায় লাভ যথেষ্ট। পাশাপাশি, ভাগলপুর নীলচাষের অন্যতম বড় কেন্দ্র। জনসন সাহেবের অবস্থাও যথেষ্ট স্বচ্ছল। ভাগলপুরের নদী-পাহাড়-বনে ঘুরতে ঘুরতে ডিরোজিওর দিন কাটতে লাগল পরম আনন্দে।
কাব্যচর্চা শুরু করলেন ‘জুভেনিস’ ছদ্মনাম নিয়ে। কলকাতায় ‘ইন্ডিয়া গেজেট’-এর সম্পাদক গ্রান্টকে লেখাগুলি পাঠাতেন। গ্রান্টের উৎসাহেই ১৮২৭ সালে ভাগলপুরে থাকাকালীন তাঁর লেখা ৪৭টি কবিতা সংকলিত করে ‘পোয়েমস’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করলেন। উৎসর্গ করলেন গ্রান্টকে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘জাঙ্গিরার ফকির’ তিনি উৎসর্গ করেছিলেন উইলসনকে। ১৮৪৮ সালে বাংলা ভাষার প্রথম
স্ব-দেশ প্রেমের কবিতা ‘ভারতের ভাগ্য বিপ্লব’ রচনা করেন কবি ঈশ্বর গুপ্ত। তবে তাঁর কুড়ি বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৮২৮ সালে এক ভারতীয় প্রথম স্ব-দেশপ্রেমমূলক কবিতা লিখে ফেলেছেন ‘টু ইন্ডিয়া— মাই নেটিভ ল্যাণ্ড’ ইংরেজি ভাষায় । তিনি আর কেউ নন, তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতিম লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। নামে বিদেশি মনে হলেও তিনি ছিলেন খাঁটি স্বদেশ প্রেমিক ভারতীয়।
এদিকে ইংরেজি শিক্ষা তথা পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষার মধ্যে দিয়েই যে কেবল বাঙালিদের অগ্রগতি সম্ভব তা ইতিমধ্যে ভালোমতন বুঝেছিলেন আধুনিকতার অগ্রদূত রামমোহন রায়। পাশাপাশি বাঙালি ছেলেদের ইংরেজি শেখাতে নিজের জীবন যৌবন উৎসর্গ করেছিলেন ডেভিড হেয়ারের মত মানুষ। সেকালের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তৎকালীন কলকাতা কোর্টের প্রধান বিচারপতি হাইড ইস্টের বাড়িতে আলোচনায় বসতেন। এরকম কয়েক দফা আলোচনার ফসল হিসাবে ১৮১৭ সালের ২০ জানুয়ারি হিন্দু কলেজ-এর প্রতিষ্ঠা হলো। ১৮২৬ সাল নাগাদ সেই কলেজেই অধ্যাপনার কাজে যোগ দিলেন ডিরোজিও। চিরাচরিত নিয়মে যেমন আঁধার রাতের পরে আসে কলতানময় প্রভাত ঠিক তেমনই নতুন আশার আলোর সম্ভাবনা নিয়ে সূচনা হল নব্যযুগের।
ডিরোজিও প্রথম ছাত্রদের মধ্যে জাগিয়ে তুললেন জিজ্ঞাসা-প্রবৃত্তি এবং জ্ঞানতৃষ্ণা। তিনিই ভেবেছিলেন শিক্ষক হিসাবে তাঁর প্রধান কাজ হবে ছাত্রদের সংবেদনশীলতাকে মার্জিত করে তোলা। ডিরোজিও ছাত্রদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন— ‘আমি দেখছি, সদ্যফোটা ফুলের মতন পাপড়ি মেলে তোমাদের প্রতিভার মুকুল ফুটে উঠছে, মনের কপাট খুলে যাচ্ছে একে একে এবং যে মোহের বন্ধনে তোমাদের প্রচণ্ড ধীশক্তি আজ শৃঙ্খলিত তাও ক্রমে ক্রমে ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। পাখির ছানার মতন তোমাদের ডানা ঝাপটানি শুনছি আমি, আর কান পেতে আছি কবে নীড়ের বন্ধন ছেড়ে, মুক্ত ডানায় ভর দিয়ে, উধাও হবে তোমরা অনন্ত আকাশের সীমার সন্ধানে’।
ডিরোজিও তাঁর শিক্ষক ড্রামন্ড সাহেবের কাছ থেকে পেয়েছিলেন যুক্তিবাদের আদর্শ। সেই আদর্শকে পাথেয় করেই ছাত্রদের দিতে শুরু করলেন পাশ্চাত্য শিক্ষার দীক্ষা। হিন্দু স্কুলের ছাত্রদের পরিচয় করালেন পাশ্চাত্য দার্শনিক বেকন, লক, বার্কলে, হিউম, রিড, স্টুয়ার্ট, পেইন প্রমুখের রচনার সঙ্গে। এর ফলেই ছাত্রদের গতানুগতিক চিন্তাধারাতে বৈপ্লবিক আলোড়নের সূত্রপাত ঘটে। নতুন ভাবের বন্যায় ভেসে গিয়ে ছাত্রদের কাছে শাস্ত্র মানেই মনে হল অযৌক্তিকতা, সংস্কার মানেই অমানবিক এবং দেবদেবীরা— মৃত অতীতের কাল্পনিক ‘টোটেম’ মাত্র। ড্রামন্ড সাহেবের বাড়িতে যেমন মাঝে-মধ্যে সান্ধ্য আসরে আলোচনা হত দেশ-বিদেশের দর্শনের আলোচনা, সেরকম ডিরোজিও প্রতিষ্ঠা করলেন অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন-এর। ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষকদের বয়সের পার্থক্য বেশি না থাকায় মন খুলে তাঁরা সব বিষয়ে মন খুলে আলোচনা করতে পারতেন। স্কুলের মধ্যে এবং স্কুলের বাইরে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে এক নতুন সমীকরণ যোগ করল। এভাবে অচিরেই শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে ভেদাভেদ ঘুচল— তাঁরা সব বিষয়ে প্রশ্ন করতে শিখলেন। এই তার্কিক ডিরোজিওপন্থী নবীন তরুণদলের মধ্যে ছিলেন— রসিকলাল মল্লিক, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, রামতনু লাহিড়ী, হরচন্দ্র ঘোষ, শিবচন্দ্র দেব, প্যারীচাঁদ মিত্র, রাধানাথ শিকদার, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, যাঁরা পরিচিতি পেলেন ‘নব্যবঙ্গ’ হিসাবে।
ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি নব্যযুবকদের মননে ডিরোজিও প্রবেশ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন— ‘To live and die for truth’ নামক বেকনের সেই বিখ্যাত উক্তিটিকে। তাই অচিরেই ডিরোজিয়ানরা খাদ্যাভাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, দেশীয় প্রথা, আচার-আচরণ সবকিছুর বিরুদ্ধেই ‘জেহাদ’ জারি করল। ইতিমধ্যে, ১৮২৯ সালে ‘সতীদাহ প্রথা’ আইনত নিষিদ্ধ হতেই ডিরোজিও তার সমর্থনে লিখলেন কবিতা।
অন্যদিকে, ক্রিশ্চান মিশনারির আলেকজান্ডার ডাফ তাঁর কলেজ স্কোয়ারের বাড়িতে ধর্মীয় সভার আহ্বান জানাতেই কলেজের ছাত্ররা উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। হিন্দুবিরোধী কার্যকলাপের খবর আগে থেকেই পৌঁছেছিল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে। প্রধান শিক্ষক আনসেল্ম হুলিয়া জারি করলেন, ছাত্রদের কোনও ধর্মীয় আলোচনায় যোগদান করা নিষিদ্ধ। ‘ইয়ং বেঙ্গল’ গোষ্ঠীর কার্যকলাপ এবং সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্রিশ্চিয়ান মিশনারির ধর্মপ্রচার কলেজ কর্তৃপক্ষের মনে এই বদ্ধমূল ধারণার জন্ম দিল যে, সবকিছুর মূলে রয়েছেন ‘প্রভাবশালী’ শিক্ষক ডিরোজিও। প্রভাবশালীদের বহু নাটকের পরে ১৮৩১ সালের ২৫ এপ্রিল পদত্যাগ করলেন ডিরোজিও। শিক্ষকজীবন শেষ হওয়ার আট মাসের মধ্যেই কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ডিরোজিওর। ডিরোজিওর অকাল প্রয়াণ বহু পরিকল্পনায় বিঘ্ন ঘটালেও নতুন যুগের আহ্বানে তিনি পূর্ণমাত্রায় সফল। তাঁর কর্মোদ্যোগের ফলেই পরবর্তীকালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কার প্রচেষ্টা বিশেষভাবে বেগবান হয়েছিল— এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না।
ডিরোজিও আসলে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন এক মুক্ত সমাজ, যেখানে থাকবে না গোলামির লেশমাত্র। সে গোলামি গোঁড়া ধর্মের আচারসর্বস্বতার কাছে হোক কিংবা পরাধীনতার শৃঙ্খলের আবদ্ধতায় হোক। সে কারণেই তাঁর জন্মের দু’শো বছর পরেও বাঙালির মনে যুক্তিবাদী ভাবনার ধারাটি বয়ে চলেছে অন্তঃসলিলা নদীর মতো। একসময় ফরাসি বিপ্লবের রণডঙ্কা বেজে উঠেছিল প্রাচীনত্ব বিলোপের আহ্বান জানিয়ে৷
যুক্তির জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল মান্যতার শক্তি। বাংলা নবজাগরণের এই পর্ব যদিও ফরাসি বিপ্লবের মতো বিশ্বজনীন প্রভাব ফেলেনি, তবে ইংরাজি শিক্ষা প্রচলনে ভারতবর্ষের ইতিহাসে সদূরপ্রসারী ছাপ ফেলেছিল। বাংলার নবজাগরণে তাই রামমোহন রায়কে যদি আমরা সংগ্রামী জ্যোতিষ্ক হিসাবে দেখি, তাহলে ডিরোজিওকে অবশ্যই অস্তাচলের জ্যোতিষ্ক হিসাবে আখ্যায়িত করতে হবে।