সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত

AI

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দলবদল, বিধায়কদের আনুগত্য এবং রাজনৈতিক দলের বৈধ পরিচয় নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরে। তৃণমূল কংগ্রেসের দশ বিধায়কের বিরুদ্ধে দলত্যাগ-বিরোধী আইনে দায়ের হওয়া আবেদনের বিষয়ে ৮ অক্টোবরের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিধানসভার স্পিকারের প্রতি আদালতের প্রত্যাশা সেই কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। ৮ জুলাই ওই বিধায়কদের বিরুদ্ধে আবেদনগুলি দায়ের করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের ২০২০ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ের ভিত্তিতে তিন মাসের মধ্যে এমন আবেদনের নিষ্পত্তি করা উচিত বলে আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে।
এখানে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হল— দলত্যাগ-বিরোধী আইন যদি থাকে, তবে তার প্রয়োগে অযথা দীর্ঘসূত্রিতা কেন হবে? সংবিধানের দশম তফসিলের উদ্দেশ্যই হল নির্বাচিত প্রতিনিধি দলীয় আনুগত্যের নির্দিষ্ট নিয়ম ভঙ্গ করলে তার বিধায়কপদ নিয়ে দ্রুত সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের ব্যবস্থা করা। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘ বিলম্ব হলে আইনটির উদ্দেশ্যই অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, একটি আবেদন বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট বিধায়ক সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন এবং সেই সময়ের রাজনৈতিক সমীকরণও বদলে যেতে পারে।
২০২০ সালে কীশাম মেঘচন্দ্র সিং বনাম মণিপুর বিধানসভার স্পিকার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, দলত্যাগের অভিযোগে স্পিকার যখন সিদ্ধান্ত দেন, তখন তিনি একটি ট্রাইব্যুনালের মতো ভূমিকা পালন করেন এবং সেই ক্ষমতা যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে প্রয়োগ করা উচিত। আদালত সাধারণ পরিস্থিতিতে তিন মাসের একটি সময়সীমার কথা বলেছিল। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মামলায় সেই নীতিই প্রয়োগ করে ৮ জুলাই থেকে তিন মাস পূর্ণ হওয়ার তারিখ ৮ অক্টোবর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
তবে এই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ভুলে গেলে চলবে না। সুপ্রিম কোর্ট দশ বিধায়ককে দলত্যাগী বলে ঘোষণা করেনি। তাঁদের বিধায়কপদ খারিজ হওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্নের মীমাংসাও করেনি। আদালতের হস্তক্ষেপ মূলত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময়ের প্রশ্নে। অর্থাৎ অভিযোগের সত্যতা এবং তার সাংবিধানিক পরিণতি নির্ধারণের দায়িত্ব এখনও স্পিকারেরই। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত মানেই কোনও একটি গোষ্ঠীর পক্ষে সিদ্ধান্ত নয়। দ্রুততার সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত এবং নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই আসল কথা। সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের বক্তব্য শোনা, প্রমাণ ও নথি পরীক্ষা করা এবং দশম তফসিলের বিধান প্রয়োগ করা— সবই যথাযথভাবে করতে হবে। তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনই অনির্দিষ্টকাল সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়।
এই মামলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের সামনে চলা পৃথক বিতর্কের কারণে। এই দলের কোন গোষ্ঠী নাম ও প্রতীক ব্যবহারের অধিকারী, সেই প্রশ্নও কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে। ফলে একই রাজনৈতিক বিভাজনকে ঘিরে একদিকে স্পিকারের সামনে বিধায়কদের দলত্যাগের প্রশ্ন, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের সামনে দলের পরিচয় ও প্রতীকের প্রশ্ন— দুটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া পাশাপাশি চলছে।
এখানেই সময়ের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কোনও সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন অনিশ্চিত থাকলে সেই অনিশ্চয়তা নিজেই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই স্পিকার এবং নির্বাচন কমিশন— উভয় ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সাংবিধানিক দায়িত্ব দ্রুত, স্বচ্ছ এবং আইনসম্মতভাবে পালন হওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বার্থে জরুরি।
সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণের আর একটি শিক্ষা রয়েছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনই সেই স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিও থাকতে হবে। স্পিকারের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত আইন, প্রমাণ এবং সাংবিধানিক বিধান— দলীয় রাজনৈতিক
সুবিধা নয়।
অতএব, ৮ অক্টোবর সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার একটি সময়সীমা। দশ বিধায়কের ভাগ্য কী হবে, তা স্পিকারের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে। এখানেই প্রত্যাশা, দলত্যাগ-বিরোধী আইনের প্রয়োগে পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে, যেখানে দ্রুততা, ন্যায়বিচার এবং সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা— তিনটিই একসঙ্গে বজায় থাকবে।