পাকিস্তানের বাহাওয়ালপুরে জইশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটি মার্কাজ সুবহানাল্লাহ ফের গড়ে উঠেছে— এই খবরকে নিছক একটি ভবন পুনর্নির্মাণের ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ, এই কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাস। অতীতে এই জায়গাটি জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলায় জড়িত জঙ্গিদেরও এই ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা জানা গিয়েছিল। ফলে ওই মার্কাজটির পুনর্নির্মাণ ভারতের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয়।
গত বছর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় ভারতীয় বায়ুসেনার আঘাতে এই ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু এখন গোয়েন্দা সূত্রে যে তথ্য সামনে আসছে, তা আরও চিন্তার। অভিযোগ, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারগুলির অর্থেই ওই স্থাপনার সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ হয়েছে। যদি এই তথ্য সত্যি হয়, তা হলে পাকিস্তান যে সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে শুধু লোকদেখানো ব্যবস্থা নেয়, সেই পুরনো অভিযোগই আরও জোরালো হয়।
জইশ-ই-মহম্মদ ভারতের কাছে অপরিচিত কোনো সংগঠন নয়। ২০০১ সালের সংসদ ভবনে হামলা-সহ ভারতের বিরুদ্ধে একাধিক বড় সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে এই সংগঠনের নাম জড়িয়েছে। বাহাওয়ালপুরের ঘাঁটি ধ্বংস হওয়া তাই সংগঠনটির জন্য বড় ধাক্কা ছিল। সেই ঘাঁটি আবার সক্রিয় হয়ে উঠলে নতুন করে কোনো হামলার পরিকল্পনা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলির সতর্ক থাকা স্বাভাবিক।
তবে সমস্যাটি শুধু জইশ-ই-মহম্মদকে ঘিরে নয়। আসল সমস্যা পাকিস্তানের রাষ্ট্রনীতিতে। ভারতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদকে ‘কম খরচের যুদ্ধের’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে পাকিস্তানের সামরিক-গোয়েন্দা কাঠামো। সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি না নিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে জঙ্গি পাঠিয়ে ভারতের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে আঘাত করাই এই নীতির অন্যতম লক্ষ্য। পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সময়েও সেই নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
বরং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ। সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়া— সব মিলিয়ে পাকিস্তান নিজের কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়াতে চাইছে। তাদের হিসাব হতে পারে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে যত বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠা যাবে, ভারতের সম্ভাব্য কঠোর প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রেও তত বেশি কূটনৈতিক সুরক্ষা পাওয়া যাবে।
কিন্তু এই হিসাবের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা পাকিস্তানের নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতা। যে দেশ বারবার বিদেশি ঋণ ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, তার রাষ্ট্রীয় অর্থের একটি অংশ যদি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির পরিকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যয় হয়, তা হলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বদলে যদি রাষ্ট্রের অর্থ নিরাপত্তা-ব্যবস্থার আড়ালে জঙ্গি পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করতে যায়, তা পাকিস্তানের জনগণের জন্যও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতও বহুদিন ধরে দুর্বল। দেশের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব এতটাই গভীর যে নির্বাচিত সরকারগুলি অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীনভাবে নীতি নির্ধারণ করতে পারে না। ফলে সরকার বদলালেও ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসকে হাতিয়ার করার প্রবণতা খুব একটা বদলায় না।
ভারতের অবশ্য এই বাস্তবতা সম্পর্কে কোনও বিভ্রান্তি থাকা উচিত নয়। শান্তি ও আলোচনার দরজা খোলা রাখা এক কথা, আর সন্ত্রাসের সামনে নীরব থাকা অন্য কথা। পাকিস্তানের মাটিতে কোনও জঙ্গি ঘাঁটি আবার সক্রিয় হলে এবং সেখান থেকে ভারতের বিরুদ্ধে হামলা হলে, তার জবাব দেওয়ার অধিকার ও ক্ষমতা ভারতের রয়েছে। সেই জবাব হতে হবে সন্ত্রাসের উৎসকে লক্ষ্য করে, প্রয়োজন অনুযায়ী কঠোর এবং এমন, যাতে ভবিষ্যতে হামলার পরিকল্পনা করার আগে পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বহুবার ভাবতে হয়।
পাকিস্তানেরও বোঝা উচিত— সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার করে কোনও দেশ দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ বা শক্তিশালী হতে পারে না। বাহাওয়ালপুরের একটি ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু তার মাধ্যমে যে বিপজ্জনক নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটে, তার পরিণতি এড়ানো সহজ নয়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্থায়ী শান্তির প্রথম শর্তই হল, সন্ত্রাসের আশ্রয়দাতাকে তার দায় বুঝিয়ে দেওয়া৷ প্রয়োজনে ভারত এ বিষয়ে নিশ্চয়ই নীরব থাকবে না।