হেনস্থা দুর্ভোগ

প্রতীকী চিত্র

এখন রাজ্যের মানুষের দু’টি বিষয় নিয়ে ভাবনা— ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এবং সংশোধিত তালিকায় তাদের নাম আছে কিনা, তা নিয়ে উৎকণ্ঠা উদ্বেগ। এসআইআর যদি সুষ্ঠুভাবে, সময় নিয়ে করা হত, তাহলে কারোর কিছু বলার ছিল না। সবাই চান ভোটার তালিকা স্বচ্ছ, নির্ভুল হোক— কিন্তু তা করা নিয়ে নির্বাচন কমিশন মানুষকে যেভাবে হেনস্থা করছে, যেভাবে বয়স্ক, অসুস্থ লোকদের শুনানির জন্য ডাকা হচ্ছে তা অনভিপ্রেত। কাগজের পাতা খুললে প্রতিদিনই জানা যাচ্ছে, এই এসআইআরের ডাক পেয়ে এবং পুরনো নথিপত্র খুঁজতে গিয়ে চরম অস্বস্তিতে পড়ে অনেকের মৃত্যু হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন যদি একটা সঠিক প্ল্যানিং করে হাতে সময় নিয়ে কাজটি করত, তাহলে ভালো হত— অন্তত এতগুলি মৃত্যু হত না। নির্বাচন কমিশনের প্রধান কর্তব্য সুষ্ঠুভাবে ভোটের আয়োজন করা এবং দেখা উচিত কেউ যেন তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করা থেকে বঞ্চিত না হন। প্রচুর সংখ্যায় মৃত ব্যক্তিদের নাম পুরনো ভোটার তালিকায় ঢুকে আছে— তাঁদের তালিকা থেকে অবিলম্বে বাদ দেওয়া উচিত। নির্বাচন কমিশনের কার্যাবলী নিয়ে, বিরোধী দলগুলির নেতাদের চরম ক্ষোভ এবং তাঁরা কমিশনের কাছে দাবি জানিয়েছেন, একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হোক। কেউ যেন বাদ না পড়েন।

কিন্তু তা কি আদৌ হবে? শুনানি শেষে যেভাবে এই আইনের কাজ শেষ হচ্ছে, তাতে ভুলভ্রান্তি থাকবে না। ভোটাধিকার থেকে মানুষ বাদ পড়বে না, একথা কি নির্বাচন কমিশন বলতে পারবে? সবচেয়ে যেটা পরিতাপের, তা হল শুনানি নিয়ে মানুষকে চরম দুর্ভোগ এবং দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলা। এত সব অনাকাঙ্ক্ষিত, অযাচিত ঘটনার পরও জাতীয় নির্বাচন কমিশন ২০২৬-এ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের জন্য একটি নির্ভুল নিখুত ভোটার তালিকা তৈরি করতে পারবে? কেউ বাদ যাবে না তো? ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম আছে, তাঁরা তাঁদের নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তাঁদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিতে পারবে? কারণ কমিশন যে ঝড়ের বেগে এসআইআরের কাজ করছে, তার জন্য ভোটার তালিকা যে নির্ভুল, স্বচ্ছ হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।


কমিশনের নির্দেশ, যাঁদের বয়স ৮০-র ওপর, তাঁদের শুনানিতে ডাকা হবে না। কমিশনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের ব্যাপারে বিভিন্ন বিষয়াদি জানতে চাইবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে শুনানির নোটিস পেয়ে এই বয়সের মানুষ, যাঁরা বয়সের ভারে ক্লান্ত এবং অসুস্থ, তাঁরাও শুনানি কেন্দ্রে এসে হাজির হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ মারাও যাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন যেভাবে ভোটার তালিকা নির্ভুল করার প্রয়াস নিয়েছে, তা অনেকের কাছেই যুক্তিসঙ্গত নয়। যেমন নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন কমিশনের কাজের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এসআইআরের নামে যেভাবে মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তা বাস্তবসম্মত নয়, অনাকাঙ্ক্ষিত। কমিশন এ ব্যবস্থায় কাজ নাকরলেই পারত।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই এসআইআরের বিরুদ্ধে তাঁর মতামত দিয়েছেন। এসআইআর নিয়ে যেভাবে মানুষদের দুর্ভোগের মধ্যে ফেলছে কমিশন তাকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। তিনি কড়া ভাষায় জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাজের নিন্দা করে বলেছেন, অবিলম্বে মানুষের এই দুর্ভোগ বন্ধ করা উচিত। মুখ্যমন্ত্রী কম করেও চার-পাঁচটি চিঠি লিখেছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে। তাঁকে তিনি বলেছেন, অবিলম্বে এসআইআর বন্ধ করতে। কারণ এই ব্যবস্থায় মানুষকে যেভাবে হয়রানি হতে হচ্ছে, তা শীঘ্র বন্ধ করা উচিত। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, কমিশন এই মুহূর্তে সবরকম ভোটাধিকার ‘লুণ্ঠন’ করতে ব্যস্ত। কমিশন আবার জাতীয় ভোটার দিবস পালন করার পথে চলেছে, যা দেখে তিনি স্তম্ভিত, বিস্মিত এবং বিচলিত। তাঁর সংযোজন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ পালন করা এবং বিধি নিয়ম অনুসারে মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার পরিবর্তে, কমিশন এখন নতুন নতুন অজুহাত তৈরি করে চলেছে।

কিন্তু ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ভালোভাবেই অবহিত কমিশনের সব কাজ ঠিক মতো হচ্ছে না, তা জেনেও জাতীয় ভোটার দিবস পালনকে সমর্থন জানিয়েছে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আর তিন-চার মাস বাকি। এখন থেকেই একদিকে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রচার চালাচ্ছে— অন্যদিকে বিরোধীরাও বসে নেই। তারাও নির্বাচনে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। আবার এসআইআরের কাজও পুরোদমে চলছে। এখন সবার মনেই কৌতূহল, যাঁরা ভোটাধিকার হারাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে আসল ভোটদাতারা আছেন কিনা। অনেকের মতে, যতই নির্বাচন কমিশন এসআইআর নিয়ে লাফালাফি করুক, একশ শতাংশ নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।