ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ নির্বাচন কমিশনকে যে স্বাধীনতা ও ক্ষমতা দিয়েছে, তা নিছক প্রশাসনিক সুবিধার জন্য নয়। এই ক্ষমতার মূল লক্ষ্য ছিল— নির্বাচন প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা। কিন্তু কাগজে-কলমে থাকা ক্ষমতা এবং বাস্তবে তার প্রয়োগ— এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। আজকের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি প্রশ্ন– নির্বাচন কমিশন কি তার ক্ষমতা প্রয়োগে যথেষ্ট ইচ্ছাশক্তি দেখাচ্ছে?
৩২৪ অনুচ্ছেদের কাঠামো অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্যের উপর দাঁড়িয়ে। একদিকে কমিশনকে নির্বাহী হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, অন্যদিকে তাকে দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যেও রাখা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ সুরক্ষিত— সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতোই তার অপসারণের প্রক্রিয়া কঠিন। এই সুরক্ষা একটি মৌলিক উদ্বেগের প্রতিফলন: নির্বাচনের নিরপেক্ষতা যেন কোনও রাজনৈতিক চাপের কাছে নত না হয়। কিন্তু এই সুরক্ষাই যদি কর্মবিমুখতার আড়াল হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক।
১৯৭৮ সালে মহিন্দর সিং গিল বনাম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয়— ৩২৪ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা বিস্তৃত হলেও তা অসীম নয়। আইন যেখানে নীরব, সেখানে কমিশন হস্তক্ষেপ করতে পারে; কিন্তু যেখানে আইন স্পষ্ট, সেখানে তাকে সেই কাঠামোর মধ্যেই কাজ করতে হবে। অর্থাৎ, ক্ষমতার প্রয়োগে সংযম এবং ধারাবাহিকতা— এই দুই-ই বিশ্বাসযোগ্যতার মূল চাবিকাঠি। শুধুমাত্র ক্ষমতা থাকা যথেষ্ট নয়; সেই ক্ষমতা কীভাবে এবং কখন প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেটাই আসল।
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এই নীতিরই অবক্ষয় নির্দেশ করছে। মালদহে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে নিযুক্ত বিচারবিভাগীয় কর্মীদের ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে রাখার ঘটনা নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়— এটি একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের লক্ষণ। যখন আদালত-নিযুক্ত কর্মীরাই তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে বাধাপ্রাপ্ত হন, তখন তা সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্তের পর্যবেক্ষণ— এই ধরনের ঘটনা ভোট প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা হতে পারে— এই উদ্বেগকে আরও জোরালো করে।
আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক। লক্ষাধিক মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা প্রশাসনিক অবহেলার ইঙ্গিত দেয় না, বরং এটি গণতান্ত্রিক অধিকারের মূল ভিত্তিকেই নাড়া দেয়। ভোটাধিকার আইনি অধিকার হলেও, তার গুরুত্ব সংবিধানের আত্মার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যখন নাগরিকেরা নিজেদের নাম তালিকায় খুঁজে পান না, তখন গণতন্ত্রের প্রতি তাঁদের আস্থা স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুণ্ণ হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ— আপিল প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা— একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এই প্রক্রিয়া কার্যকর করার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের উপরই বর্তায়। কমিশন যদি দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষভাবে প্রতিক্রিয়া না জানায়, তবে ক্ষতি আরও গভীর হয়। ভুলের চেয়েও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে নীরবতা বা অস্পষ্টতা।
১৯৯৫ সালের টি এন শেষন বনাম কেন্দ্র সরকারের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয় যে, নির্বাচন কমিশন একটি সমষ্টিগত প্রতিষ্ঠান; এটি কোনও একক ব্যক্তির কর্তৃত্বের উপর নির্ভরশীল নয়। এই রায়ের মূল বার্তা ছিল— প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা তার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার উপর নির্ভর করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বার্তাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কমিশনের কার্যকলাপ যদি ব্যক্তিনির্ভর বা অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, তবে তার প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ঘিরে অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) সংক্রান্ত বিতর্ক এবং তার দ্রুত খারিজ হয়ে যাওয়া আরও একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছে— জবাবদিহিতা কোথায়? সংবিধান কমিশনকে রাজনৈতিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে চায়, কিন্তু সেই সুরক্ষা যদি স্বচ্ছতার অভাব তৈরি করে, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। কোনও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানই পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে নয়; বরং স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিতার ভারসাম্যই গণতন্ত্রের আসল শক্তি।
আজ নির্বাচন কমিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তার হাতে সংবিধানপ্রদত্ত ক্ষমতা রয়েছে, বিচারবিভাগের সমর্থন রয়েছে এবং একটি দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্যও রয়েছে। কিন্তু এই সবকিছুর পরেও মূল প্রশ্ন থেকে যায়— এই ক্ষমতাগুলিকে কি যথাসময়ে এবং নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হবে?
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেখানে কমিশনের ভূমিকা শুধুমাত্র পর্যবেক্ষকের হতে পারে না। তাকে হতে হবে সক্রিয় প্রহরী, যে নজর রাখবে, প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করবে, এবং সর্বোপরি নাগরিকদের আস্থা পুনর্গঠনে উদ্যোগী হবে। এখন দেখার, পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন নিজেকে সেই প্রহরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাকি নীরব দর্শকের ভূমিকাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।