যে স্বপ্নের উড়ান থামেনি

Image: SNS

২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ভোর ২টা ৫৫ মিনিটে শ্রীহরিকোটা থেকে আকাশের দিকে উঠে গেল ইসরোর জিএসএলভি-এফ১৭। তার ভিতরে ২,৩৬৭ কিলোগ্রাম ওজনের ইওএস-০৫। জিএসএলভির ১৯তম এই উড়ান ভারতের মহাকাশ গবেষণায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করল। ভূসমলয় কক্ষপথ থেকে ভারত ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি এই উপগ্রহ যেন মহাকাশে তুলে দিল দেশের এক নতুন চোখ।

ইওএস-০৫-এর গুরুত্ব বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় পাঁচ বছর আগে। ২০২১ সালের ১২ অগস্ট জিএসএলভি-এফ১০-এর মাধ্যমে ইওএস-০৩ বা জিআইস্যাট-১-কে মহাকাশে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছিল। প্রথম দুই ধাপ স্বাভাবিকভাবে এগোলেও ক্রায়োজেনিক তৃতীয় স্তরে সমস্যা দেখা দেয়। নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছতে পারেনি উপগ্রহটি। বহু বছরের প্রস্তুতির পর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্ন থেমে গিয়েছিল উৎক্ষেপণের কয়েক মিনিটের মধ্যেই।

কিন্তু মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে ব্যর্থতা অনেক সময় পরবর্তী সাফল্যের ভিত তৈরি করে। ইসরোর ব্যর্থতা বিশ্লেষণ কমিটি সমস্যার কারণ খুঁজে বের করে। তরল হাইড্রোজেন ট্যাঙ্কের চাপ কমে যাওয়া এবং ভেন্ট অ্যান্ড রিলিফ ভাল্‌ভের সম্ভাব্য ত্রুটির সঙ্গে সেই ব্যর্থতার যোগ পাওয়া যায়। কোথায় ভুল হয়েছিল, কেন হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে কী ভাবে এমন পরিস্থিতি এড়ানো যায়— তার উত্তর খুঁজতে শুরু হয় নতুন করে পরীক্ষা ও সংশোধনের কাজ।


পাঁচ বছর পরে সেই অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষাই ফিরে এল নতুন উপগ্রহের যান্ত্রিক শরীরে। ইওএস-০৫ আগের হারিয়ে যাওয়া উপগ্রহটি নয়। এটি তার উত্তরসূরি। পুরনো অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তৈরি নতুন মহাকাশযান। ফলে এবারের সাফল্যের মধ্যে একটি উৎক্ষেপণের কৃতিত্বের পাশাপাশি রয়েছে দীর্ঘ পরীক্ষার ফল এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। ইওএস-০৫-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা তার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায়। পৃথিবীর প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতার ভূসমলয় কক্ষপথ থেকে এটি ভারত ও সংলগ্ন অঞ্চলের উপর দীর্ঘ সময় নজর রাখতে পারবে যেমন ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ, বন্যার বিস্তার, কৃষিজমির পরিবর্তন, বনভূমির পরিস্থিতি, জলসম্পদ এবং পরিবেশের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে এই তথ্য বিশেষ কাজে আসতে পারে।

একটি ঘূর্ণিঝড় যখন সমুদ্র থেকে স্থলের দিকে এগিয়ে আসে, তখন প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, কোন দিকে ঝড় এগিয়ে চলেছে, কোন অঞ্চলে বিপদের আশঙ্কা বাড়ছে— এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দ্রুত পাওয়া গেলে প্রশাসনের প্রস্তুতিও দ্রুত করা সম্ভব। বন্যার ক্ষেত্রেও মহাকাশ থেকে পাওয়া ছবি জানাতে পারে কোন অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, কোথায় জল ছড়িয়ে পড়েছে এবং কোন পথে উদ্ধার ও ত্রাণের কাজ এগোনো প্রয়োজন।

কৃষিক্ষেত্রেও উপগ্রহটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সুবৃহৎ এলাকা জুড়ে ফসলের পরিস্থিতি, জমির পরিবর্তন, জলসম্পদের বিস্তার এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে মহাকাশচিত্র ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ইওএস-০৫ সেই নজরদারিকে আরও দ্রুত ও নিবিড় করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

পৃথিবীকে মহাকাশ থেকে পর্যবেক্ষণের এই প্রযুক্তিতে ভারত অবশ্য একা নয়। আমেরিকার গোয়েস, জাপানের হিমাওয়ারি, ইউরোপের মেটিওস্যাট এবং চিনের ফেংইউন-৪-এর মতো ভূসমলয় উপগ্রহ বহুদিন ধরে পৃথিবী ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতও সেই আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করছে। ইওএস-০৫ সেই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

এই প্রকল্পের ইতিহাসে তাই সাফল্যের চেয়েও বেশি করে মনে পড়ে অধ্যবসায়ের কথা। ২০২১ সালে একটি উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হওয়ার পরও থেমে যায়নি সেই প্রয়াস। কোথায় ত্রুটি হয়েছিল, কেন হয়েছিল, কী ভাবে তাকে দূর করা যায়— বিজ্ঞানীরা ফিরে গিয়েছেন প্রতিটি ক্ষুদ্রাতি-ক্ষুদ্র সমস্যার কাছে। তাঁরা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। প্রযুক্তিগত ত্রুটি সংশোধন করেছেন। এমনকি নকশাও বদলাতে হয়েছে। তারপর দীর্ঘ প্রস্তুতির শেষে তৈরি হয়েছে নতুন উপগ্রহ। মহাকাশ বিজ্ঞানে সাফল্য অনেক সময় এক মুহূর্তে ধরা দেয়, কিন্তু তার ভিত তৈরি হয় এমনই দীর্ঘ অধ্যবসায়, পরীক্ষা ও অপেক্ষার মধ্য দিয়ে।

শ্রীহরিকোটা থেকে জিএসএলভি-এফ১৭ যখন অন্ধকার আকাশ পেরিয়ে মহাকাশের দিকে ছুটছিল, তখন তার সঙ্গে উঠে যাচ্ছিল কয়েক বছরের অপেক্ষা এবং পরিশ্রমের ফল। সেই রকেটের ভিতরে ছিল ধাতু, সৌরপ্যানেল, সেন্সর ও অসংখ্য বৈদ্যুতিন যন্ত্র। কিন্তু তার ভিতরে ছিল নিজের ভূখণ্ডকে গভীর ভাবে জানার এক দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা।

ইওএস-০৫ পৃথিবীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে মহাকাশ থেকে। তার সংগৃহীত তথ্য পৌঁছে যাবে বিজ্ঞানী, প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রয়োগক্ষেত্রে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে হয়তো কোনও দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি নেওয়া যাবে, কোনও অঞ্চলের কৃষি পরিস্থিতি বোঝা যাবে বা কোনও পরিবেশগত পরিবর্তনের আগাম সংকেত পাওয়া যাবে।

ইওএস-০৫ তাই শুধু একটি উপগ্রহের সাফল্যের গল্প নয়। এর ভিতরে আছে ব্যর্থতার পর ফিরে আসার সৎ সাহস এবং ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। শ্রীহরিকোটা থেকে উঠে যাওয়া সেই নতুন চোখ নতুন দৃষ্টি নিয়ে যখন পৃথিবীর দিকে তাকাবে, তখন তার পর্যবেক্ষণ ক্ষেত্রে ধরা পড়বে ভারতের মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির সেইসব ছবি যা আগে ধরা পড়েনি এবং তার ঠিক নীচে লেখা থাকবে একটাই সত্য— রকেট থামতে পারে কিন্তু স্বপ্নের উড়ান কখনোও থামে না।