বিবাহ বনাম মানসিক অবসাদ

File Photo

এলাহাবাদ হাইকোর্ট যতই বলুক, ‘লিভ-ইন সম্পর্ক ভারতীয় মধ্যবিত্ত মানসিকতার বিরোধী’, বিবাহের বিকল্প হিসাবে এই লিভ-ইন সম্পর্ক তার দাপট এবং জনপ্রিয়তা দেখাচ্ছে। এটা শাস্ত্রবিরোধী হলেও যুগোপযোগী বলেই আধুনিক প্রজন্ম মনে করে। কারণ বিবাহের পরবর্তী সময়ে দায়ভার নেবার সময় নিজের ব্যক্তি স্বাধীনতা নষ্ট হয় বলেই জেন-জির ধারণা। বর্তমান সময় তার সুখকে কম্প্রোমাইজ বা আপোসের জায়গায় বসাতে রাজি নয়।

ফলে ভারতীয় চুক্তি আইনে বিবাহ চুক্তির বাইরে থাকলেও বর্তমানে লিভ-ইনে সেই চুক্তিরই প্রচ্ছন ইঙ্গিত রয়েছে। দুই পক্ষের নিজেদের মধ্যে যতদিন ভালো লাগবে তারা একসঙ্গে থাকবে, যখন আর ইচ্ছে করবে না তখন তারা সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসবে। বিবাহের কর্তব্য পালনের চাপ এই লিভ-ইনে নেই। ফলে এই সম্পর্কই এখন বেশ রমরম করে চলছে। আদালতকেও নতুন নতুন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মূল হিন্দু বিবাহ আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিবাহের মাধ্যমে নারীদের বশ করার একটা চক্রান্ত ছিল বলেই অনেকেই মনে করেন। অতি সম্প্রতি আদালতের বেশ কিছু পর্যবেক্ষণে মেয়েদের স্বাধীনতার দরজা খুলে দেওয়ায় পরিবার বা সর্ম্পকের মধ্যে স্বাধীনতা যেন আরও উদার হয়েছে। দুই পাখিই এখন আকাশে উড়তে চায়, ফাঁকা খাঁচা একা পড়ে থাকে। একসময় ছিল যখন মেয়েরা সংসার করত, ঘর-সংসার সামলাতো। নিজেদের জীবন উৎসর্গ করত সংসারের জন্য। সময় পালটে গেছে।


মেয়েরাও আজ কর্মমুখী। পুরুষের পক্ষে সংসার সামলানো বেশ কঠিন, কারণ সে সংসারে অভ্যস্ত নয়। বিচারপতি চিল্লাকুর সুমালতা তাঁর পর্যবেক্ষণে বলছেন, ‘বিবাহ নারী নিয়ন্ত্রণের ছাড়পত্র নয়। একজন স্বামী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না কখন তার স্ত্রী কাজ করবে বা বাবা-মাকে দেখাশোনা করবে।’ অর্থাৎ প্রথাগতভাবে যে স্ত্রীরা সংসারে কাছে দায়বদ্ধ ছিল, এবার থেকে সেখানে তারা স্বাধীনভাবে থাকতে পারবে।

সমস্যা হলো, নারী স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এইরূপ পর্যবেক্ষণ সাধুবাদ পেলেও সাংসারিক জীবনে বাধ্যবাধকতা না থাকলে অবহেলার জন্ম হবে। দরকারে পুরুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। পরিবারগুলো ভাঙছে ক্রমশ এই উদার স্বাধীনতার জন্য। কর্তব্য মানসিক চাপের কারণ হতে পারে না। একজন স্বাভাবিক সুস্থ ব্যক্তিই বিবাহের উপযুক্ত। বিবাহের পরবর্তী সময়ে তাই তাকে তার পার্টনারের জন্য কর্তব্য পালন করতেই হবে। বিবাহের মধ্যে লুকিয়ে সংযম, নিয়ন্ত্রণ, শ্রদ্ধা। তবেই সেই বিবাহ সারাজীবন থেকে যাবে। কিন্তু বর্তমানে বিবাহ মানসিক অসুখে পরিণত হচ্ছে। তথ্য বলছে, এই বিবাহ সংক্রান্ত মামলায় প্রতি বছর নম্বই হাজারের বেশি পুরুষ আত্মহত্যা করেছে।

সংখ্যাটা মেয়েদের থেকে তিনগুণ বেশি। বর্তমানের বিবাহ-পরবর্তী সময় ভয়ংকর হচ্ছে। বিবাহ ভাঙলেই হয় সহবাসের মামলা বা বধূ নির্যাতনের মামলা দেওয়া হচ্ছে, যার শতকরা ৮০ ভাগই মিথ্যা। কলুষিত হচ্ছে বিবাহের মহান আদর্শ। দেশের সর্বোচ্চ আদালতও এই বিষয়ে চিন্তিত। বিবাহ দুর্বল হলে সামাজিক সম্মান দূষিত হবে। বিচারপতি নাগারত্না তাই বিবাহ বিচ্ছেদের আগে মধ্যস্থতা করার কথা বলছেন। সম্পর্কের বাঁধনকে আরও শক্ত করতে হবে। বিবাহের আদর্শ ক্রমশ শিথিল হচ্ছে। চাহিদার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বিবাহের আধুনিক ট্রেন্ড। স্বাধীনতা উপহার দেবার নামে নৈতিকতা বিনষ্ট হওয়া থেকে সমাজকে আটকাতে হবে। সুস্থ জীবনের স্বার্থে একটা রিজনেবল রেস্ট্রিকশন বা একটা যুক্তিযুক্ত সীমাবদ্ধতা থাকবেই। হাইকোর্ট যখন বলে, ‘স্ত্রীকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখলেই ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণিত হয় না।’ তখন ঘটনাটা না জেনে শুধু এইটুকু মনে ​রেখে বলা যায়, মলাট দেখে বইয়ের বিচার হয় না। আদালত যে স্বাধীনতা দিচ্ছে সেগুলো একসময় পুরুষতান্ত্রিক মনের অযৌক্তিক ধারণা ভেঙে যাতে মেয়েরা বেরিয়ে আসতে পারে, সংসার করতে পারে। কিন্তু আদালতের রায়কে যদি কেউ বিবাহের মধ্যে থেকেও সস্তা সুখের আশায় প্রয়োগ করে তাহলে তা সমাজের চরম ক্ষতিকারক।

সম্পর্ক বিশ্বাস আর ভালোবাসার স্থায়ী বিনিয়োগ ভবিষ্যতের স্বার্থে। শুধু দেহভোগে সবকিছুই হয় না। বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য ও বিচারপতি সুপ্রতিম ভট্টাচার্য বলছেন, ‘বিচ্ছেদের পরে সহবাস মানে অতীত নির্মমতার ক্ষমা নয়।’ বিবাহের মধ্যে রয়েছে সামাজিক স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধা। শুধু সহবাস সামাজিক অপমানের ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারে না। বিবাহের মধ্যে নিজের দায় কর্তব্য পালন করতেই হবে। একই সঙ্গে অন্যের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে হবে। লিভ-ইন কোনোদিন বিবাহের বিকল্প হতে পারে না। সস্তা সুলভ জীবন অসুস্থ। বিবাহের রীতিনীতি সম্পর্কে জোর না দিয়ে শুধু আইনি পথই যথেষ্ট নয়। মনের বিনিময় যদি না হয়, তাহলে আইনের সাক্ষীর কোনও প্রাসঙ্গিকতা থাকে না।

তাই কলকাতায় হাইকোর্ট বলে, ‘বিয়ের ছবি দিলেই স্বামী স্ত্রী প্রমাণিত হয় না।’ বিবাহের মূল মন্ত্র সম্পর্কে সচেতন হবার সময় এসেছে। সম্পর্ক মজবুত না হলে সামাজিক ঐক্যের ফাটল ধরবে। বিবাহ কোনও পুতুল খেলার সামগ্রী নয়। বরং দুটো মানুষের ভালোবেসে ভালো থাকার অঙ্গীকার। কর্ণাটক হাইকোর্ট বলছে, ‘হিন্দু বিবাহ কোনও চুক্তি নয়। শুধু স্ত্রীর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন— এই কারণ দেখিয়ে স্বামী বিবাহবিচ্ছেদ চাইতে পারেন না।’