একটি সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে গাজা ইস্যু আবার বিশ্বমঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনার অধীনে হামাসের নিরস্ত্রীকরণে সম্মতির খবর— এই দুইয়ের মিলিত প্রভাব পরিস্থিতিকে নতুন দিকে নিয়ে যেতে পারে।
পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে গাজা উপত্যকা বহুদিন ধরেই সংঘাত, রক্তপাত ও অনিশ্চয়তার প্রতীক। ইজরায়েল ও হামাসের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব বারবার যুদ্ধ, ধ্বংস এবং মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে যদি কোনও পক্ষ নিরস্ত্রীকরণের পথে হাঁটার কথা ঘোষণা করে, তাহলে তা স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বজুড়ে কৌতূহল, আশা এবং সন্দেহ— তিনটিই একসঙ্গে সৃষ্টি করে। সম্প্রতি হামাসের পক্ষ থেকে ‘বোর্ড অব পিস’-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণে সম্মতির ইঙ্গিত সেই রকমই একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
এই ঘটনাটিকে বোঝার জন্য প্রথমেই ‘বোর্ড অব পিস’ কী এবং তার প্রস্তাবিত পরিকল্পনার লক্ষ্য কী, তা সংক্ষেপে জানা জরুরি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত এই সংস্থা মূলত গাজা অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং পুনর্গঠনের একটি কাঠামো তৈরি করার উদ্দেশ্যে কাজ করছে। এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল— হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণ, ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং একটি নতুন প্যালেস্তাইনি প্রশাসনের মাধ্যমে গাজার শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
যদি হামাস সত্যিই নিরস্ত্রীকরণের পথে এগিয়ে যায়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হতে পারে। কারণ হামাসের অস্ত্রভিত্তিক রাজনীতি এবং তার সামরিক কাঠামোই এতদিন এই সংঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অস্ত্র ত্যাগ মানে শুধু সামরিক শক্তির অবসান নয়, বরং রাজনৈতিক পথে সমস্যার সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি সংকেত।
তবে এই আশাবাদের পাশাপাশি একাধিক বাস্তব প্রশ্নও উঠে আসছে। প্রথমত, হামাসের এই সিদ্ধান্ত কতটা আন্তরিক এবং কতটা কৌশলগত— তা এখনও স্পষ্ট নয়। অতীতে একাধিকবার শান্তিচুক্তি বা যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি। ফলে সাধারণ প্যালেস্তাইনি জনগণের মধ্যে এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, যা সহজে দূর
হবে না।
দ্বিতীয়ত, ইজরায়েলের অবস্থান এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও পরিকল্পনা অনুযায়ী হামাস নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন হলে ইজরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে বলে জানানো হয়েছে, বাস্তবে তা কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ইজরায়েল শুরু থেকেই হামাসের ওপর আস্থা রাখতে নারাজ। তাদের আশঙ্কা, নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হলে বা তা সঠিকভাবে যাচাই না হলে নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকে যাবে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘জিরো ট্রাস্ট’ বা ‘শূন্য আস্থা’- ভিত্তিক যে কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ, কোনও পক্ষই অপর পক্ষের ওপর ভরসা করে এগোবে না, বরং প্রতিটি ধাপ যাচাই ও পর্যালোচনার মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। এই পদ্ধতি একদিকে যেমন বাস্তবসম্মত, অন্যদিকে তা প্রক্রিয়াটিকে দীর্ঘ এবং জটিল করে তুলতে পারে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ। এই বোর্ডে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মতো দেশগুলির অংশগ্রহণ একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত দেয়। তবে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও চিনের মতো বড় শক্তিগুলি এখনও এই উদ্যোগে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত না হওয়ায় একটি প্রশ্ন থেকেই যায়— এই উদ্যোগ কতটা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী হবে?
গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়েও আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি নতুন প্যালেস্তাইন সরকার এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মিলিতভাবে গাজার নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করবে। তাত্ত্বিকভাবে এটি একটি গ্রহণযোগ্য মডেল হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ প্যালেস্তাইনের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভাজন, স্থানীয় জনগণের আস্থা এবং বাহ্যিক শক্তির প্রভাব— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল।
এছাড়া, গাজার পুনর্গঠন একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও অবরোধের ফলে পরিকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। হাসপাতাল, স্কুল, বাসস্থান— সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই অবস্থায় পুনর্গঠনের জন্য বিপুল অর্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন। ‘বোর্ড অব পিস’ এই অর্থায়ন ও তদারকির দায়িত্ব নেবে বলে জানানো হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হবে, সেটিও দেখার বিষয়।
মানবিক দিক থেকেও এই সংকট গভীর। হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি, অসংখ্য শিশু নিহত হওয়া এবং লক্ষাধিক মানুষের বাস্তুচ্যুতি— এই সবকিছু মিলিয়ে গাজার মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। এই ক্ষত শুধু রাজনৈতিক চুক্তি দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি আস্থা গঠন, ন্যায়বিচার এবং মানবিক সহায়তা।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত বিতর্কও এই প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, জাতিসঙ্ঘের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন— এসবই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ, অন্যদিকে রাজনৈতিক অবস্থান— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়।
তবে হামাসের নিরস্ত্রীকরণে সম্মতির খবর নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ। কিন্তু এটি চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং একটি দীর্ঘ ও কঠিন পথের সূচনা মাত্র। এই পথ সফল করতে হলে সব পক্ষের আন্তরিকতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সর্বোপরি গাজার সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু চুক্তির মাধ্যমে হয় না, তা গড়ে ওঠে আস্থা, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। গাজার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না। তাই এই নতুন উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই একদিকে যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি সতর্ক থাকারও আহ্বান জানাচ্ছে। কারণ, শান্তির পথ কখনওই সরল নয়— বিশেষ করে যেখানে ইতিহাস এতটা রক্তাক্ত।
গাজা সংকট, ‘বোর্ড অব পিস’ ও অনিশ্চিত শান্তির পথে এক নতুন অধ্যায়
গাজা সংকট, ‘বোর্ড অব পিস’ ও অনিশ্চিত শান্তির পথে এক নতুন অধ্যায় PIC- AI