স্যার গারফিল্ড সোবার্স: বারো আঙুলের সিম্ফনি

Photo: X

নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন সোবার্স যে তিনি জন্ম ইস্তক জানতেন, তিনি একজন বড় কেউ হবেন।এহেন আত্মবিশ্বাসের কারণ ছিল এই যে তাঁর দুই হাতে একটি করে বাড়তি আঙুল ছিল।এই বাড়তি আঙুল নাকি ছিল সৌভাগ্যের প্রতীক।কথা রেখেছিলেন সোবার্স। তাঁর বারো আঙুলের ক্রিকেট সিম্ফনিতে তিনি মুগ্ধ করেছেন বিশ্ববাসীকে। চলে গেলেন সেই স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। সোবার্স আজীবন স্মৃতিতে থাকবেন ১৯৬৮ সালে গড়া তাঁর একটি কীর্তির জন্য। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটার হিসাবে এক ওভারে ছ’টি ছয় মেরেছিলেন তিনি। তবে গোটা জীবনে এ রকম কীর্তি আরও অনেক রয়েছে। সোবার্স রেখে গেলেন একরাশ স্মৃতি, যার অনেক কিছুই এখনকার প্রজন্ম জানে না। প্রাক্তন ক্রিকেটার তথা ধারাভাষ্যকার রিচি বেনো এক বার সোবার্সের বর্ণনা করেছিলেন ‘বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ড ক্রিকেটার’ বলে। তিনি লিখেছিলেন, “সোবার্স প্রতিভাবান ব্যাটার, দুর্দান্ত ফিল্ডার এবং অসাধারণ দক্ষতাসম্পন্ন একজন বোলার ছিল। নতুন বলই হোক, পুরনো বাঁ হাতি স্পিন বা লেগস্পিন সব বলই করতে পারত।” ১৯৫৩-এ ১৬ বছর বয়সে বার্বাডোজের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় সোবার্সের। তিনি এতটাই প্রতিভাবান ছিলেন যে দ্রুত দেশের হয়ে খেলার জন্য তাঁর ডাক পড়ে। পরের বছরই ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের হয়ে অভিষেক। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ছাপ ফেলতে বেশি সময় লাগেনি। ১৯৫৮-এ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম শতরান করেন। শেষ পর্যন্ত ৩৬৫ রানে অপরাজিত থাকেন। সেই সময়ে সেটিই ছিল টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। এর পর ১৯৯৪-এ সেটি ভাঙেন ব্রায়ান লারা।সোবার্স ১৯৭৪-এ ৩৮ বছর বয়সে অবসর নিয়েছিলেন। অনেকেই মনে করেন, যে মাপের ক্রিকেটার ছিলেন তাতে অবসর একটু আগেভাগেই নিয়ে ফেলেছিলেন।তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্ব-চ্যাম্পিয়ন। ’৬৭-’৬৮ সালে ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট সিরিজ চলছে। তিনটি টেস্ট ড্র হয়েছে। চতুর্থ টেস্টের পঞ্চম দিন। সেই টেস্টও ড্র হওয়ার দিকেই চলেছে। এই সময়, সম্ভবত দলের দুই উইকেটে ৯২ রানে, সোবার্স অধিনায়ক হিসেবে ইনিংস ডিক্লেয়ার করলেন। এবং যত দূর মনে পড়ছে, ইংল্যান্ডকে ১৫০ বা ১৬৫ মিনিটে ২১৫ রান করবার একটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন। তখন কিন্তু টি ২০, এমনকি ওয়ান ডে-ও ছিল না। ফলে, তখন দ্রুত রান করাটা একটু কঠিন।
সে-সময়ে ইংল্যান্ডের ব্যাটররা, বয়কট, কাউড্রে, এডরিচ— এঁরা সব ধীর গতির ব্যাটিং-এর জন্যই বিখ্যাত ছিলেন। কিন্তু খুব আশ্চর্য ভাবে বয়কট মারমুখী হয়ে উঠলেন। এবং এক উইকেট পড়তেই, ব্যাটিং অর্ডারে আগে উঠিয়ে আনা হল উইকেট কিপার অ্যালান নট-কে। যিনি আক্রমণাত্মক ব্যাটিং-এর জন্য প্রসিদ্ধ। ইংল্যান্ড তিন উইকেটে ২১৫ রান তুলে, সেই টেস্ট তথা সিরিজ জিতে নিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে থাকা আঘাত পেল, সেই প্রথম! সঙ্গে-সঙ্গে সমালোচনার ঝড় বয়ে গেল সোবার্সকে নিয়ে। কারণ, তিনি ইনিংস ডিক্লেয়ার না করলে স্বাভাবিক ভাবেই খেলাটি ড্র হত, এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নই থেকে যেত। এই সমালোচনার ফলে সোবার্সের শত্রুরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেন। সোবার্স এই সব সমালোচনার প্রসঙ্গে একটি ছোট উত্তর দিয়েছিলেন তখন। কুড়ি বছর পরেও, তাঁর উত্তর কোনও দিন পাল্টায়নি। সোবার্স খুবই দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। অর্থোপার্জনের জন্য কৈশোরে ব্যান্ড বাজাতেন।
’৭৫ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলার খুব ইচ্ছে ছিল সোবার্সের, কিন্তু তা সত্ত্বেও ’৭৩ সালেই অবসর নিতে তিনি বাধ্য হন। ’৬৭ সালের ওই ডিক্লারেশনের ২০ বছর পর, ’৮৭ সালে ইংল্যান্ডে তিনি এলে সাংবাদিকরা তাঁকে প্রশ্ন করেন, ২০ বছর আগেকার তাঁর ওই সিদ্ধান্ত যা তাঁর ক্রিকেট-জীবনকে অবনমনের দিকে নিয়ে আসে, সে-বিষয়ে তিনি আজ কী মনে করেন? সেটা কি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল?
সোবার্স দু-দশক আগেকার মতোই শান্ত স্বরে উত্তরে বলেন, “আমি পাঁচটা ‘ড্র্যাব ড্র’ চাইনি। চেয়েছিলাম, ফলাফল হোক। অর্থাৎ খেলাটার জয় হোক। তাই হয়েছে।” তাঁর অবসরের পর ‘উইসডেন’ লিখেছিল, “সোবার্স মানসিক এবং শারীরিক ভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। যে ক্রিকেট তাঁর জীবনের সমান ছিল, সেই ক্রিকেট সম্পর্কেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। হাঁটুরও চরম ক্ষতি হয়েছিল। নিজের প্রতিভার শিকার হয়েছিলেন সোবার্স। কারণ তিনি অনেক কিছু করতে পারতেন। তাই বার বার সেই কাজ করতেই ডাকা হয়। অনেক ক্রিকেটারের চেয়ে বেশি খেটেছেন তিনি।”
সব মিলিয়ে সোবার্স ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের হয়ে ৯৩টি টেস্ট খেলে ৮০৩২ রান করেছেন। বল হাতে ২৩৫টি উইকেট নিয়েছেন। গড় ৫৭.৭৮। ৫০০০ বা তার বেশি রান করেছেন, এমন ক্রিকেটারদের তালিকায় সোবার্সের গড় চতুর্থ সর্বোচ্চ। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৩৮৩টি ম্যাচ খেলে ২৮ হাজারের বেশি রান করেছেন এবং ১০০০-এর বেশি উইকেট নিয়েছেন। কেরিয়ারের শেষের দিকে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া এবং নটিংহ্যামশায়ারে সময় কাটান।
নিজের কেরিয়ারের আসল সময়ে সোবার্সকে ডাকা হত ‘কিং ক্রিকেট’ বলে। উইসডেনের তরফে তিন বার ‘লিডিং ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জেতেন। ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান তাঁর চেয়ে বেশি বার এই পুরস্কার জিতেছেন। সোবার্স সম্পর্কে ব্র্যাডম্যান বলেছিলেন, “আমার দেখা অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার।”
সোবার্সের আত্মজীবনীতে বহু ভারতীয় ক্রিকেটারের উল্লেখ রয়েছে। তবে ফিল্ডিং-এর উপর একটি আলাদা অধ্যায় লিখেছিলেন সোবার্স, যেখানে উল্লেখ করেছেন চুনিদা’র মানে আমাদের চুনি গোস্বামীর। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে একটি খেলায় প্রায় কুড়ি পা পেছনে দৌড়ে একটি ক্যাচ ধরেছিলেন চুনি গোস্বামী যা নজর কেড়েছিল সোবার্সের। খবর নিয়ে জেনেছিলেন এই চুনি গোস্বামী ভারতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক। আলাদা করে হাত মিলিয়েছিলেন চুনিদা’র সঙ্গে।

আগেই চলে গেছেন চুনি গোস্বামী,এবার চলে গেলেন সোবার্স। আমাদের প্রজন্মের তিনি ক্রিকেট রূপকথার রাজপুত্র।