আমেরিকার রাজনীতিতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কখনও শুধুমাত্র অর্থনীতির বিষয় নয়, তা ভোটের রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। গাড়িতে জ্বালানি ভরতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যখন আগের তুলনায় দ্বিগুণ অর্থ খরচ করেন, তখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল ব্যাখ্যা তাঁদের ক্ষোভ কমাতে পারে না। তাঁরা জানতে চান, সংসার চালানোর খরচ কেন বাড়ছে এবং সরকার তাঁদের স্বস্তি দিতে কী করছে। এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোর চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু প্রশ্ন হল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাঁর পক্ষে কি সত্যিই পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব?
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক সংঘাত, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বিশ্ববাজারের অস্থিরতা। ইরানকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খেয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পরিবহণ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এই প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এখানকার অস্থিরতা শুধু আমেরিকা নয়, ইউরোপ ও এশিয়ার বহু দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত। ফলে তেলের বাজারে একাধিক সংকট একসঙ্গে কাজ করছে। ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালনে প্রায় তিন ডলার থেকে ছয় ডলারে পৌঁছনোর পেছনে হরমুজ প্রণালির সংকটের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেরও বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বাজারের বিশেষজ্ঞেরা। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে থাকলে তার প্রভাব পড়ে পেট্রোল ও ডিজেলের দামে। পরিবহণ ব্যয় বাড়ে, কৃষির উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের
দামও চড়ে।
অর্থাৎ, জ্বালানির দাম বাড়লে সমস্যা কেবল গাড়ির মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ট্রাক পরিবহন সংস্থা থেকে শুরু করে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ক্রেতা— সকলেই তার বোঝা বহন করেন। পণ্য পরিবহণে খরচ বাড়লে সেই অতিরিক্ত ব্যয় ক্রমে বাজারদরে যুক্ত হয়। ফলে মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। একদিকে সংসারের খরচ বাড়ে, অন্যদিকে সুদের হার বৃদ্ধির কারণে ঋণ নেওয়াও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। এই দ্বিমুখী চাপে অর্থনীতির উপর অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এই পরিস্থিতিই ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা শুধু সরকারের প্রতিশ্রুতি বিচার করেন না, দৈনন্দিন জীবনে সেই প্রতিশ্রুতির ফল কতটা পাচ্ছেন, সেটাও দেখেন। অর্থনীতি সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে তাঁর দলের প্রার্থীদের উপর। তাই জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগকে নিছক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে নির্বাচনী কৌশলও স্পষ্ট।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলির মধ্যে রয়েছে বিশেষ ধরনের লাল রং মেশানো ডিজেল ব্যবহারের উপর সাময়িক ছাড় দেওয়া। এই ডিজেল সাধারণত কৃষিকাজ, নির্মাণকাজ এবং অন্যান্য অফ-রোড ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট থাকে। এতে করের বোঝা কম। প্রশাসনের উদ্দেশ্য, এই জ্বালানি সড়ক পরিবহণেও ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে ট্রাকচালক ও পরিবহণ সংস্থাকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া।
কিন্তু এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। লাল রং মেশানো ডিজেল ও সাধারণ ডিজেলের মধ্যে মূল পার্থক্য রাসায়নিক গুণে নয়, বরং ব্যবহারের নিয়ম ও করের ব্যবস্থায়। এই রং একবার গাড়ির জ্বালানি ট্যাঙ্কে ঢুকলে তা পরিষ্কার করা কঠিন। সাময়িক ছাড় শেষ হওয়ার পর ট্যাঙ্কে ওই জ্বালানির অবশিষ্টাংশ থাকলেও পরিবহণ সংস্থাকে জরিমানা বা আইনি সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে। তা ছাড়া কৃষি ও নির্মাণক্ষেত্রের জন্য বরাদ্দ জ্বালানি বেশি পরিমাণে সড়ক পরিবহণে ব্যবহৃত হলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলিতেও সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, একদিকে সাশ্রয় ঘটাতে গিয়ে অন্যদিকে নতুন সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
তুলনায় জ্বালানির মজুত থেকে তেল ও ডিজেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত কিছুটা বেশি কার্যকর হতে পারে। ট্রাম্পের চাপের পর জি-৭ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও ডিজেল ছাড়ার ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণার ফলে বাজারে সরবরাহ বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম নির্ধারণে বাস্তব সরবরাহের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সরবরাহ সম্পর্কে বাজারের ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মজুত ছাড়ার ঘোষণা কিছুটা মূল্যহ্রাসে সাহায্য করতে পারে।
তবে এই সমাধান স্থায়ী নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে মজুতের উপর নির্ভরতা বাড়তেই থাকবে। একসময় সেই মজুত পুনরায় পূরণ করতে হবে। ততদিনে যদি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, তবে দামের উপর চাপ বজায় থাকার আশঙ্কা থাকবে। যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তেল উৎপাদন ও পরিশোধন কেন্দ্রগুলিকে পুরোপুরি সচল করতেও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
সুতরাং, আজ মজুত থেকে তেল ছেড়ে কালই জ্বালানির দাম আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। ট্রাম্প আরও একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপের কথা বলেছেন— পেট্রোলের উপর ফেডারেল কর সাময়িকভাবে স্থগিত করা। পাশাপাশি কয়েকটি রাজ্যকে রাজ্যস্তরের জ্বালানি কর কমানোর জন্য চাপ দিয়েছেন। ওহাইও ও জর্জিয়ার মতো রাজ্যে কর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এই ধরনের সিদ্ধান্ত সরাসরি ক্রেতার পাম্পে দেওয়া অর্থ কিছুটা কমাতে পারে। কিন্তু ফেডারেল কর স্থগিত করতে কংগ্রেসের সহযোগিতা প্রয়োজন। নির্বাচনের আগে সেই রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া সহজ হবে না।
এখানে আরও একটি অর্থনৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। জ্বালানি কর থেকে সরকার যে রাজস্ব পায়, তা সড়ক ও অন্যান্য পরিকাঠামোর ব্যয় মেটাতে সাহায্য করে। কর কমালে সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিক স্বস্তি পেতে পারেন, কিন্তু সরকারের আয়ও কমে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সরকারি ব্যয়ের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। আবার তেলের দাম বেশি থাকার মূল কারণ যদি আন্তর্জাতিক সরবরাহের সংকট হয়, তবে কর কমিয়ে সেই সংকটের সমাধান করা যায় না। শুধু ভোক্তার খরচের একটি অংশ কমানো সম্ভব।
আমেরিকা থেকে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবও সমস্যার সহজ সমাধান নয়। দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ বাড়লে কিছু অঞ্চলে দাম কমতে পারে। কিন্তু আমেরিকার সব অঞ্চলে এর সমান সুফল পৌঁছবে না। বরং রপ্তানি বন্ধ হলে দেশীয় বাজারে জ্বালানি জমিয়ে রাখার প্রবণতা বাড়তে পারে। মজুত রাখার জায়গা পূর্ণ হয়ে গেলে শোধনাগারগুলিকে উৎপাদন কমাতে হতে পারে। তার ফলে ডিজেলের পাশাপাশি পেট্রোলের মতো অন্যান্য জ্বালানির দামও বাড়তে পারে। অর্থাৎ, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দাম কমানোর চেষ্টা উল্টো ফলও দিতে পারে।
আসল সমস্যা তাই অর্থনীতির চেয়ে বড়— এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত। হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনা, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানের দিকে এগোনো ছাড়া জ্বালানির বাজারকে স্থায়ী স্বস্তি দেওয়া কঠিন। অথচ এই ঘটনাগুলির কোনওটিই শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইচ্ছায় নিয়ন্ত্রিত হয় না। কূটনীতি, সামরিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সিদ্ধান্ত এখানে নির্ণায়ক।
ট্রাম্পের সামনে তাই দ্বিমুখী পরীক্ষা। একদিকে তাঁকে এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ দ্রুত কিছুটা স্বস্তি পান। অন্যদিকে, তাঁকে বোঝাতে হবে যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় তাঁর প্রশাসনের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা রয়েছে। সাময়িক করছাড়, মজুত থেকে তেল ছাড়া কিংবা বিশেষ জ্বালানি ব্যবহারের অনুমতি— এসব ব্যবস্থা পরিস্থিতির তীব্রতা কিছুটা কমাতে পারে। কিন্তু এগুলিকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে তুলে ধরা কঠিন।
শেষ পর্যন্ত ভোটাররা শুধু ঘোষণার হিসাব করবেন না, পেট্রোল পাম্পে কত টাকা দিতে হচ্ছে, বাজারে জিনিসপত্রের দাম কতটা বাড়ছে এবং সংসারের খরচ সামলানো কতটা সহজ হচ্ছে, সেটাই তাঁদের কাছে বড় হয়ে উঠবে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প হয়তো কিছুটা রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংঘাতের অবসান এবং জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত না হলে সেই সুবিধা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। জ্বালানির দাম কমানোর ক্ষেত্রে তাঁর হাতে থাকা ছোট ছোট প্রশাসনিক অস্ত্রের সীমা স্পষ্ট। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব স্বস্তিতে রূপান্তর করতে হলে তাঁকে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের রাজনীতি থেকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে এগোতেই হবে।