স্ট্রিং থিয়োরি থেকে কৃষ্ণগহ্বরের রহস্য—এক বাঙালি বিজ্ঞানীর বিশ্বজয়

File Photo

মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ কি শেষ পর্যন্ত একটিমাত্র মৌলিক সূত্রের অধীন? কৃষ্ণগহ্বরের গভীরে কী ঘটে? মহাকর্ষ ও কোয়ান্টাম জগতের মধ্যে কি কোনও সেতুবন্ধন সম্ভব? মহাবিশ্বের গভীরে কি এমন কোনও একক সূত্র লুকিয়ে আছে, যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা থেকে শুরু করে মহাকর্ষের বিপুল শক্তি? যে মহাকর্ষ আমাদের পৃথিবীর মাটিতে ধরে রাখে, সেই মহাকর্ষের সঙ্গে কোয়ান্টাম জগতের অদ্ভুত নিয়মের সম্পর্ক কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান প্রবেশ করেছে এক বিস্ময়কর জগতে। সেখানে কণা আর বিন্দু নয়, স্থান ও সময়ও হয়তো চিরপরিচিত অর্থে মৌলিক নয়।

এই গভীর অনুসন্ধানের অন্যতম পথিকৃৎ কলকাতার বাঙালি পদার্থবিদ অধ্যাপক অশোক সেন। ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর, সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের নোবেল কমিটি ফর ফিজিক্সের সঙ্গে যুক্ত অস্কার ক্লাইন পদকে সম্মানিত হলেন তিনি । স্ট্রিং থিয়োরি, কৃষ্ণগহ্বরের এনট্রপি এবং স্ট্রিং ফিল্ড থিয়োরিতে তাঁর যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতি এই সম্মান। ২২ অক্টোবর ২০২৬-এ তাঁর কর্মস্থল ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল সায়েন্সেস (আইসিটিএস) এই পুরস্কারের কথা ঘোষণা করে। এই সম্মান তাঁকে এনে দিল এক ঐতিহাসিক পরিচয়— তিনি এই পদকপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয় পদার্থবিদ।

এই পদকটি স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের নোবেল কমিটি ফর ফিজিক্স যৌথভাবে প্রদান করে। তবে এটি পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার নয়; এটি নিজস্ব ঐতিহ্য ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মান।


১৯৫৬ সালের ১৫ জুলাই কলকাতায় জন্ম অশোক সেনের। তাঁর বাবা অনিলকুমার সেন ছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। কলকাতার শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর ১৯৭৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক হন। এরপর আইআইটি কানপুরে স্নাতকোত্তর এবং আমেরিকার স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক, স্টনি ব্রুকে ১৯৮২ সালে পিএইচডি অর্জন করেন। তারপর ফার্মিল্যাব ও স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর সেন্টারে গবেষণার পর ১৯৮৮ সালে দেশে ফিরে যোগ দেন টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে। পরবর্তীকালে হরিশচন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউটে দীর্ঘদিন গবেষণা করেন। ২০২১ সালে তিনি বেঙ্গালুরুর আইসিটিএস- এ যোগ দেন।

বর্তমানে তিনি আইসিটিএস- ইনফোসিস মাধব চেয়ার অধ্যাপক। তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র স্ট্রিং থিয়োরি—একটি তাত্ত্বিক কাঠামো, যা প্রকৃতির মৌলিক কণা ও বলগুলিকে একই গাণিতিক কাঠামোয় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে।

স্ট্রিং থিওরি বলতে আমরা কী বুঝি, সেটা প্রথমে জানা দরকার। স্ট্রিং থিওরি হল কণার বদলে কম্পনশীল সুতো। আরেকটু বিশদভাবে বললে বলতে হয়— আমাদের চারপাশের জগৎ গড়ে উঠেছে পরমাণু দিয়ে। পরমাণুর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন। আরও গভীরে গেলে দেখা যায় কোয়ার্ক ও অন্যান্য মৌলিক কণা। কিন্তু স্ট্রিং থিয়োরি এক অভিনব ধারণা সামনে আনে—মৌলিক কণাগুলি আসলে অতি ক্ষুদ্র কম্পনশীল সুতোর মতো বস্তু হতে পারে।

একটি বেহালার তার যেমন বিভিন্ন কম্পাঙ্কে কম্পিত হয়ে বিভিন্ন সুর সৃষ্টি করে, তেমনই এই অতিক্ষুদ্র স্ট্রিংয়ের বিভিন্ন কম্পন থেকে বিভিন্ন মৌলিক কণার বৈশিষ্ট্য তৈরি হতে পারে। স্ট্রিংয়ের একটি কম্পন ইলেকট্রনের মতো, অন্যটি কোয়ার্কের মতো কণার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এই ধারণা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কারণ প্রকৃতির মৌলিক কণাগুলিকে আলাদা আলাদা বস্তু হিসেবে না দেখে, একটি সাধারণ মৌলিক কাঠামোর বিভিন্ন প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হতে পারে। তবে স্ট্রিং থিয়োরি এখনও পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত চূড়ান্ত তত্ত্ব নয়। এর অনেক পূর্বাভাস বর্তমান প্রযুক্তিতে সরাসরি যাচাই করা কঠিন। তবু এই তত্ত্বের গাণিতিক কাঠামো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে বহু নতুন আবিষ্কারের পথ খুলে দিয়েছে।

অশোক সেনের অন্যতম যুগান্তকারী অবদান হলো এস–ডুয়ালিটি বা শক্তিশালী-দুর্বল দ্বৈততা অর্থাৎ শক্তিশালী ও দুর্বল বলের মধ্যে সেতুবন্ধন। পদার্থবিজ্ঞানে কোনও ব্যবস্থার পারস্পরিক ক্রিয়ার শক্তি খুব বেশি হলে তার গাণিতিক হিসাব অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে। কিন্তু একই ব্যবস্থার দুর্বল পারস্পরিক ক্রিয়ার অবস্থায় হিসাব তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।

অশোক সেন দেখিয়েছিলেন, নির্দিষ্ট কিছু সুপারসিমেট্রিক স্ট্রিং ও গেজ তত্ত্বে শক্তিশালী কাপলিং-এর একটি তত্ত্ব দুর্বল কাপলিং-এর অন্য একটি তত্ত্বের সমতুল্য হতে পারে। অর্থাৎ, যে সমস্যার সমাধান একটি তত্ত্বে অত্যন্ত কঠিন, তার উত্তর পাওয়া যেতে পারে অন্য একটি তত্ত্বের সাহায্যে। এটি যেন একটি জটিল তালার চাবি অন্য তালায় খুঁজে পাওয়া। এই ধারণা বিভিন্ন স্ট্রিং থিয়োরির মধ্যে গভীর সম্পর্ক আবিষ্কারের পথ খুলে দেয়।

২০১২ সালে অশোক সেন ব্রেকথ্রু প্রাইজ ইন ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স লাভ করেন। পুরস্কারের স্বীকৃতিতে বলা হয়, তাঁর কাজ স্ট্রিং থিয়োরিগুলিকে একটি একক অন্তর্নিহিত তত্ত্বের বিভিন্ন সীমা হিসেবে বোঝার পথ উন্মুক্ত করেছে।

কৃষ্ণগহ্বর আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম রহস্যময় বস্তু। এর মহাকর্ষ এতটাই শক্তিশালী যে, একটি নির্দিষ্ট সীমা বা ঘটনা দিগন্তের (ইভেন্ট হরাইজন) ভিতর থেকে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। ১৯৭০-এর দশকে জ্যাকব বেকেনস্টাইন ও স্টিফেন হকিং দেখিয়েছিলেন, কৃষ্ণগহ্বরের এনট্রপি তার ঘটনা দিগন্তের ক্ষেত্রফলের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু প্রশ্ন ছিল— এই এনট্রপি আসলে কীসের পরিমাপ? কৃষ্ণগহ্বরের অভ্যন্তরে কতগুলি সম্ভাব্য কোয়ান্টাম অবস্থা রয়েছে, তার সঙ্গে কি এর সম্পর্ক আছে? এখানেই অশোক সেনের কাজ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

একটি গ্যাসের এনট্রপি যেমন তার অণুগুলির সম্ভাব্য বিন্যাসের সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, তেমনই কৃষ্ণগহ্বরের এনট্রপিও কি তার অন্তর্নিহিত কোয়ান্টাম অবস্থার সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? অশোক সেনের গবেষণা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি স্ট্রিং থিয়োরির সাহায্যে কৃষ্ণগহ্বরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোয়ান্টাম অবস্থা বা মাইক্রোস্টেট গণনার পদ্ধতি উন্নত করেন। তাঁর প্রবর্তিত ‘এনট্রপি ফাংশন ফরমালিজিম’ কৃষ্ণগহ্বরের ম্যাক্রোস্কোপিক বৈশিষ্ট্য এবং তার অন্তর্নিহিত কোয়ান্টাম অবস্থার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সহজভাবে বললে, একটি কৃষ্ণগহ্বর বাইরে থেকে দেখতে যতই সরল মনে হোক, তার ভিতরে বিপুল সংখ্যক সম্ভাব্য কোয়ান্টাম বিন্যাস থাকতে পারে। সেই বিন্যাসগুলির সংখ্যা থেকেই এনট্রপির ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এই গবেষণা কোয়ান্টাম মহাকর্ষ সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে গভীরভাবে করেছে।

অশোক সেনের বিজ্ঞানসাধনা বহু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৮৯ সালে আইসিটিপি পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার, ২০০৯ সালে ইনফোসিস পুরস্কার, ২০১২ সালে ব্রেকথ্রু পুরস্কার এবং ২০১৪ সালে ডিরাক পদক তাঁর উল্লেখযোগ্য সম্মানগুলির মধ্যে রয়েছে। ২০০১ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১৩ সালে পদ্মভূষণেও সম্মানিত হন তিনি। ২০২৬ সালের অস্কার ক্লাইন পদক তাঁর গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

অশোক সেনের গবেষণার অধিকাংশই এমন এক জগৎ নিয়ে, যা আমাদের চোখে দেখা যায় না, পরীক্ষাগারে সহজে ধরা পড়ে না। তবু তাঁর গাণিতিক অনুসন্ধান মহাবিশ্বের মৌলিক কাঠামো সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এবং পুরনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করেছে।

কলকাতার এক ছাত্রের গবেষণা আজ মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্যের আলোচনায় বিশ্ববিজ্ঞানের কেন্দ্রে। তাঁর অস্কার ক্লাইন পদক শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, ভারতের মৌলিক বিজ্ঞানচর্চারও গৌরব। বিজ্ঞান যে কেবল দৃশ্যমান জগতের ব্যাখ্যা নয়, অদৃশ্যের ভিতরেও সত্যের সন্ধান—অশোক সেনের জীবন ও গবেষণা তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।