রাষ্ট্রসঙ্ঘের আসন্ন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের পরীক্ষায় বিশ্ব

Photo: Social Media

জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ আজ আর ভবিষ্যতের কোনও আশঙ্কা নয়। তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি— বিশ্বের নানা প্রান্তে এর প্রভাব ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের জলবায়ু সম্মেলন, কপ-৩১। এই সম্মেলনের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পরিবেশ রক্ষায় এতদিনের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর করা সম্ভব হবে?

প্যারিস জলবায়ু চুক্তি কার্যকর করার দশ বছর এবার। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল বিশ্ব উষ্ণায়নকে ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। কিন্তু শুধু লক্ষ্য ঘোষণা করে এই বিপদ ঠেকানো যাবে না। প্রয়োজন গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো, পরিচ্ছন্ন শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় বিপন্ন দেশগুলিকে যথেষ্ট অর্থ ও প্রযুক্তিগত সাহায্য দেওয়া। এখন দেখার এই লক্ষমাত্রা আদপে কতটা কার্যকরী করা যায়।

কপ-৩১-এর অন্যতম কঠিন বিষয় হতে পারে কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার কমানোর প্রশ্ন। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। তাই বিশ্ব উষ্ণায়ন কমাতে এর ব্যবহার থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। কিন্তু সব দেশের পরিস্থিতি এক নয়। অনেক উন্নত দেশ দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভর করে শিল্পোন্নয়ন করেছে। অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে বিদ্যুৎ, শিল্প এবং কর্মসংস্থান বাড়ানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।


ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও জটিল। কয়লার উপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের জোগান, বিদ্যুতের দাম এবং শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে হবে। তাই পরিচ্ছন্ন শক্তিতে রূপান্তরের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থসাহায্য ও প্রযুক্তি হস্তান্তর অত্যন্ত জরুরি। ভারত গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন কপ সম্মেলনে এই নিয়ে অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও বার বার সেই লক্ষমাত্রা থেকে সরে আসছে।

কপ-৩১-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় জলবায়ু অর্থায়ন। ২০২৪ সালে বাকুতে অনুষ্ঠিত কপ-২৯-এ উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের লক্ষ্য স্থির হয়েছিল। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি-সহ বিভিন্ন উৎস থেকে বছরে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থায়নে পৌঁছনোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার কথা বলা হয়।

কিন্তু অর্থের অঙ্ক ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। সেই অর্থ কতটা বাস্তবে পাওয়া যাচ্ছে, কতটা ঋণ এবং কতটা অনুদান, বিপন্ন দেশগুলি কত সহজে তা ব্যবহার করতে পারছে— এসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের ঐতিহাসিক দায় উন্নত দেশগুলির বেশি হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলি তাদের কাছ থেকে আরও নির্ভরযোগ্য সহায়তা দাবি করে আসছে।

জলবায়ু পরিবর্তন পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও তার ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা করা যায়। একেই বলা হয় অভিযোজন বা অ্যাডাপ্টেশন। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, খরা মোকাবিলা, জল সংরক্ষণ, তাপপ্রবাহের সতর্কতা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং উপকূল রক্ষার মতো ব্যবস্থা এর অন্তর্গত। কপ-৩১-এ এই উদ্যোগগুলির জন্য অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

এর পাশাপাশি রয়েছে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির মোকাবিলা। কোনও দ্বীপরাষ্ট্রের ভূখণ্ড সমুদ্রের গ্রাসে চলে যাওয়া, ঘূর্ণিঝড়ে মানুষের ঘরবাড়ি ও জীবিকা ধ্বংস হওয়া কিংবা দীর্ঘস্থায়ী খরায় কৃষির বিপর্যয়— সব ক্ষতি শুধু অভিযোজনের মাধ্যমে সামাল দেওয়া যায় না। এই ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। এর জন্য নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দের দাবি বিগত কয়েকটি কপে বিশেষ জোরদার হয়েছে। দেখাযাক এবারে এটা নিয়ে কী হয়।

ভারতের পাশাপাশি এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশের দাবি, জলবায়ু নীতির নামে তাদের উন্নয়নের অধিকার খর্ব করা যাবে না। ‘সাধারণ কিন্তু পৃথক দায়িত্ব’ নীতির অর্থ হল, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা সবার কর্তব্য হলেও ঐতিহাসিক দায় এবং আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সামর্থ্য সব দেশের সমান নয়।

কপ-৩১-এর মূল বক্তব্যকে এক কথায় প্রকাশ করতে হলে বলতে হয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বকে এখন প্রতিশ্রুতির পর্যায় পেরিয়ে বাস্তবায়নের পথে এগোতে হবে। এতদিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নানা লক্ষ্য, চুক্তি ও ঘোষণা গৃহীত হয়েছে। কিন্তু নির্গমন কমানো, জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো এবং বিপন্ন মানুষের সুরক্ষায় সেই প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তাই কপ-৩১-এর সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার সংখ্যা দিয়ে নয়, বাস্তবে কী পরিবর্তন ঘটল তার ভিত্তিতে।

কপ-৩১-এর সাফল্য বিচার করতে হবে কয়েকটি স্পষ্ট মাপকাঠিতে— নির্গমন কমানোর বাস্তব পদক্ষেপ, জলবায়ু অর্থের নির্ভরযোগ্য জোগান, অভিযোজনের কার্যকর পরিকল্পনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, শহর ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেগুলি রাষ্ট্রগুলির আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না।

তবে এই বাস্তবায়নের পথ নিয়ে মতপার্থক্যও কম নয়। উন্নত দেশগুলি দ্রুত নির্গমন কমানোর উপর জোর দিলেও উন্নয়নশীল দেশগুলির বক্তব্য, পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া তাদের পক্ষে একই গতিতে এগোনো সম্ভব নয়। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি ভোগ করছে এমন বহু দেশ ও জনগোষ্ঠী দ্রুত আর্থিক সহায়তা চাইছে। ফলে কপ-৩১-এর সামনে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে— দেশগুলি তাদের প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর করবে, সেই পরিবর্তনের খরচ কে বহন করবে এবং তার সুফল ও দায়ভার কীভাবে ন্যায্যভাবে ভাগ হবে?