খনিজ থেকে কূটনীতি, বিরল মৃত্তিকার নতুন রাজনীতি

Photo: Statesman

বিমানবন্দরে লাল কার্পেট পাতা। দূর থেকে দেখলে রাষ্ট্রীয় সৌজন্যের পরিচিত ছবি মনে হতে পারে। কিন্তু সেই ছবির ভিতরে যেন সময়ের বদলে যাওয়া ছন্দের আভাস পাওয়া যায়। চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে স্বাগত জানাতে নিজেই বিমানবন্দরে হাজির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সঙ্গে মেলানিয়া ট্রাম্প। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পরে শি-র মার্কিন সফর। ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা তাই কেবল প্রোটোকলের ব্যতিক্রম হয়ে থাকেনি। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নিরাপত্তা এবং বিরল মৃত্তিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে ঘিরে ওয়াশিংটন-বেজিংয়ের টানাপড়েনের মধ্যে এই দৃশ্য বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে।

এর কয়েক দিন আগেই আমেরিকা রাশিয়া ও ইরানকে ঘিরে নতুন নিষেধাজ্ঞার আইন করেছে। ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট, ২০২৬’ অনুযায়ী রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পেয়েছে মার্কিন প্রশাসন। আইনটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপায় না, তবে সেই ক্ষমতার দরজা খুলে দিয়েছে। ভারত ও চিন—রাশিয়ার জ্বালানির বৃহৎ ক্রেতা—এই ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে। নিউ ইয়র্কে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়োর সঙ্গে বৈঠকে ভারতের উদ্বেগের কথাও জানিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর।

এই দুই দৃশ্য পাশাপাশি রাখলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। একই ওয়াশিংটন যখন ভারতের মতো দেশের সঙ্গে শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কঠিন দর-কষাকষি করছে, তখন চিনের রাষ্ট্রপ্রধানকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজে হাজির হচ্ছেন। এর পিছনে একমাত্র কারণ খুঁজলে ভুল হবে। তবু সেই অঙ্কে বিরল মৃত্তিকা যে গুরুত্বপূর্ণ একটি সংখ্যা, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ কম।


বিরল মৃত্তিকা নামটি শুনলেই মনে হতে পারে যে, পৃথিবীর মাটিতে এদের অস্তিত্ব অত্যন্ত সামান্য। কিন্তু বাস্তবটি একটু অন্য রকম। ল্যান্থানাইড শ্রেণির ১৫-টি মৌল, সঙ্গে স্ক্যান্ডিয়াম ও ইট্রিয়াম— মোট ১৭টি মৌলকে সাধারণত রেয়ার আর্থ বলা হয়। পৃথিবীর ভূত্বকে এদের অনেকগুলিই একেবারে অতি বিরল নয়। আসল সমস্যা হল, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ঘনত্বে এদের খুঁজে পাওয়া, উত্তোলন করা এবং একে অন্যের থেকে পৃথক করা বেশ জটিল। তাই রেয়ার আর্থের শক্তি শুধু খনিতে নয়; তার আসল মূল্য নিহিত রয়েছে উত্তোলন থেকে পরিশোধন ও ধাতু তৈরি থেকে শক্তিশালী চুম্বক উৎপাদনের প্রযুক্তিতে।

আধুনিক পৃথিবীর বহু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের ভিতরে এই অচেনা মৌলগুলির উপস্থিতি রয়েছে। নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়াম শক্তিশালী স্থায়ী চুম্বক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়ামের মতো মৌল উচ্চ তাপমাত্রাতেও চুম্বকের কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, বায়ু-বিদ্যুৎ টারবাইন, রোবোটিক্স, উন্নত ইলেকট্রনিক যন্ত্র, মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে তাই রেয়ার আর্থের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে।

চিনের শক্তি ঠিক এখানেই। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে রেয়ার আর্থ উত্তোলনের ৭০ শতাংশের বেশি এবং প্রক্রিয়াকরণের প্রায় ৮৭ শতাংশ চিনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ভারী রেয়ার আর্থের গুরুত্বপূর্ণ দুই মৌল ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়ামের ক্ষেত্রে চিনের অবস্থান আরও শক্তিশালী।

অর্থাৎ চিনের হাতে শুধু খনি নেই, রয়েছে শিল্পের মাঝের এবং শেষের গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলি। এই জায়গাটিই তাকে কূটনৈতিক শক্তি দিয়েছে। রেয়ার আর্থের সরবরাহকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও চিনের টানাপড়েন তাই নিছক বাণিজ্যিক বিরোধ নয়। এটি আধুনিক প্রযুক্তির সরবরাহশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণের লড়াই। সাম্প্রতিক মার্কিন-চিন আলোচনাতেও বিরল মৃত্তিকার সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

এবার ভারতের দিকে তাকানো যাক

বিরল মৃত্তিকার বিশ্বরাজনীতিতে ভারতও একেবারে প্রান্তে দাঁড়িয়ে নেই। বরং আমাদের মাটির নীচেও লুকিয়ে রয়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদের উল্লেখযোগ্য ভাণ্ডার। পরমাণু শক্তি দফতরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে চিহ্নিত ১৩.১৫ মিলিয়ন টন মোনাজাইট সম্পদের মধ্যে প্রায় ৭.২৩ মিলিয়ন টন রেয়ার আর্থ অক্সাইড সমতুল্য সম্পদ রয়েছে। সমুদ্রতীরের বালুকাস্তর থেকে দেশের অভ্যন্তরের কিছু পলিমাটি— বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক পরিবেশে এই সম্পদের সন্ধান মিলেছে। অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, তামিলনাড়ু, কেরল, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডেও রেয়ার আর্থ-সমৃদ্ধ মোনাজাইটের উপস্থিতি চিহ্নিত হয়েছে। শুধু উপকূলীয় বালিই নয়, গুজরাট ও রাজস্থানের কঠিন শিলাস্তরেও প্রায় ১.২৯ মিলিয়ন টন রেয়ার আর্থ অক্সাইড সমতুল্য সম্পদ চিহ্নিত হয়েছে।

অর্থাৎ ভারতের সামনে প্রশ্নটি সম্পদের অস্তিত্ব নিয়ে নয়। আমাদের মাটিতে এই মূল্যবান খনিজ রয়েছে। প্রশ্ন হল, সেই মাটির নীচে ঘুমিয়ে থাকা সম্পদকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে উত্তোলন করে আধুনিক প্রযুক্তির শিল্পশক্তিতে রূপ দেওয়া যায়। খনিজসম্পদকে যদি কেবল মাটির নীচের সম্পদ হিসেবেই রেখে দেওয়া হয়, তবে তার মূল্য সীমিত; তাকে প্রযুক্তি ও শিল্পে রূপান্তর করতে পারলেই সেই সম্পদ জাতীয় শক্তিতে পরিণত হয়।

তাহলে ভারতের দুর্বলতা কোথায়?

সম্পদের অভাবে নয়। মূল সমস্যা হল সম্পদকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে রূপান্তর করার মধ্যবর্তী শিল্পক্ষমতার ঘাটতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গবেষণাক্ষেত্রের দুর্বলতা। মৌলিক বিজ্ঞান থেকে প্রযুক্তিগত গবেষণা— কোনও ক্ষেত্রেই এখনও বিশ্বমানের উৎকর্ষ তৈরি হয়নি। বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মানও সেই কারণে প্রশ্নের মুখে। কাগজের ডিগ্রিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতায় গবেষণার প্রকৃত ক্ষেত্রটি অনেক সময় পিছনে পড়ে থাকে। পর্যাপ্ত পুঁজি বিনিয়োগের অভাব দক্ষ গবেষকদেরও হতাশ করে। ফলে মেধার বিদেশমুখী স্রোত ভারতের কাছে নতুন কোনও ঘটনা নয়।

এখন সরকারের টনক নড়েছে। কিন্তু রাতারাতি এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ বিজ্ঞানীদের একটি শক্তিশালী দল, উৎকর্ষমানের গবেষণা এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। সেই পূর্ণাঙ্গ পরিকাঠামো এখনও ভারতে তৈরি হয়নি— এটাই আক্ষেপের। প্রকৃতি ভারতকে দু’হাত ভরে সম্পদ দিয়েছে। সেই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার শেষ পর্যন্ত দেশের মানুষকেই করতে হবে। বিজ্ঞানমনস্কতা ও গবেষণার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব ছাড়া সেই কাজে এগিয়ে যাওয়া কঠিন।

ভারতের হাতে খনি, পৃথকীকরণ এবং অক্সাইড পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু অক্সাইড থেকে ধাতু, ধাতু থেকে সংকর এবং সংকর থেকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চুম্বক তৈরির শিল্পপরিকাঠামো দীর্ঘদিন যথেষ্ট শক্তিশালী হয়নি। ফলে বর্তমানে ভারতের সিন্টার্ড নিওডিমিয়াম-আয়রন-বোরন স্থায়ী চুম্বকের চাহিদা প্রায় সম্পূর্ণটাই আমদানিনির্ভর। সরকারি মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০৩০ সালে ভারতে এই চুম্বকের সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় ৮,২২০ টন হতে পারে।

এই ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ অবশ্য শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ৭,২৮০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছে। লক্ষ্য বছরে ৬,০০০ টন সমন্বিত রেয়ার আর্থ স্থায়ী চুম্বক উৎপাদনক্ষমতা গড়ে তোলা— অক্সাইড থেকে ধাতু, ধাতু থেকে সংকর এবং শেষ পর্যন্ত চুম্বক। ২০২৬–২৭ সালের বাজেটে ওড়িশা, কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুকে ঘিরে রেয়ার আর্থ করিডরের কথাও ঘোষণা হয়েছে। এই পরিবর্তনের গুরুত্ব এখানেই। আগামী দিনের বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ু-বিদ্যুৎ, রোবোটিক্স, প্রতিরক্ষা ও উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প যত বাড়বে, রেয়ার আর্থের প্রয়োজনও তত বাড়বে। তখন কোনও দেশের শক্তি শুধু তার ভূগর্ভে কত খনিজ আছে, তা দিয়ে মাপা হবে না। প্রশ্ন হবে— সেই খনিজকে কে প্রযুক্তিতে পরিণত করতে পারে, কে সরবরাহশৃঙ্খল গড়ে তুলতে পারে এবং কে অন্য দেশের প্রয়োজনের জায়গায় নিজের সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারে। এই কারণেই আজ খনিজ থেকে কূটনীতি তৈরি হচ্ছে।

একদিন তেল ছিল বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রধান অস্ত্র। এখন পাশে দাঁড়িয়েছে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিরল মৃত্তিকা। বিমানবন্দরের লাল কার্পেটের দৃশ্য তাই কেবল দুই রাষ্ট্রপ্রধানের সৌজন্য বিনিময় নয়। তার নীচে রয়েছে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ, শিল্পের নিরাপত্তা এবং সরবরাহশৃঙ্খলের অঙ্ক।

মাটির নীচে থাকা একটি অচেনা ধাতু কী ভাবে রাষ্ট্রের কূটনীতির ভাষা বদলে দিতে পারে, শি জিনপিংকে স্বাগত জানাতে ট্রাম্পের সেই দৃশ্য তারই এক সাম্প্রতিক প্রতীক।

খনিজ যখন শিল্পে রূপ নেয়, শিল্প যখন নির্ভরতা তৈরি করে, তখন সেই নির্ভরতাই একসময় কূটনীতির শক্তি হয়ে ওঠে। বিরল মৃত্তিকার নতুন রাজনীতির মর্মবাণী বোধহয় এখানেই।