অদৃশ্য ভাইরাস থেকে দৃশ্যমান সংকট: শক্তির শিরায় আঘাতের বিশ্বকথা

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

উজ্জ্বলকুমার দত্ত

বিশ্বজুড়ে যখনই কোনও সংকটের ঘন কালো ছায়া নেমে আসে, তখন আমাদের ভেতরে এক অদ্ভুত সান্ত্বনা কাজ করে— যেন এ সবই সাময়িক, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। বাজার তার নিজস্ব নিয়মে ভারসাম্য খুঁজে নেবে ও জীবনের গতি আবার আগের মতো স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসবে। এই বিশ্বাসটা যেন আমাদের বেঁচে থাকারই এক সহজ কৌশল— এক ধরনের মানসিক আশ্রয়। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম শিক্ষক। ইতিহাস বারেবারে প্রমাণ করেছে যে সব সংকট একরকম হয় না। কিছু সংকট আসে ঢেউয়ের মতো— আছড়ে পড়ে, আবার সরে যায়। আবার কিছু সংকট নিঃশব্দে এসে বসে পড়ে আমাদের জীবনের গভীরে যেন অযাচিত (Unsolicited) অতিথি। এর ফলশ্রুতিতে আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সমাজ ব্যবস্থার রূপরেখা, এমনকি ভবিষ্যৎ কল্পনার দিকনির্দেশনার সুঠাম ভিতটাও ধীরে-ধীরে আলগা হয়ে যায়।

আজকের এই জ্বালানি সংকট তেমনই এক নীরব অথচ গভীর অভিঘাত। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা কেবল তেলের দামের ওঠানামার গল্প নয়; এটিকে বলা যেতে পারে এক অদৃশ্য চাপ, যা বিশ্ব অর্থনীতির শিরায়-শিরায় প্রবাহিত হয়ে আমাদের সামনে তুলে ধরছে এক অস্বস্তিকর সত্য। এতদিন আমরা ভেবেছি যে বাজার অর্থনীতিই শেষ কথা। বৈশ্বিক চাহিদা ও জোগানের অঙ্কই সব ঠিক করে। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, সেই অঙ্কের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল কিছু অজানা শূন্যস্থান ও কিছু অব্যক্ত দুর্বলতা— যা আমাদের তাবড় তাবড় ডিপ্লোম্যাটদের চোখে ধরা পড়েনি।


সমস্যাটি যেন ক্রমশ এমন এক গভীরতার দিকে এগোচ্ছে, যা কোভিড-১৯-এর দিনগুলোকেও ম্লান করে দিতে পারে। সেখানে ছিল এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই— ভাইরাসের সঙ্গে প্রতিদিনের সহাবস্থান এবং মৃত্যুভয়ের ভিতরেও বেঁচে থাকার এক জেদ। মানুষ ঘরবন্দি ছিল ঠিকই কিন্তু পৃথিবীর চালিকাশক্তি পুরোপুরি থেমে যায়নি। অর্থনীতির গায়ে ধাক্কা লেগেছিল, তবুও কোথাও যেন একটা বিশ্বাস ছিল যে এই লড়াই শেষ হবে। মানুষের বিশ্বাস জয়ী হবে। জীবন আবার ফিরে পাবে তার পুরনো ছন্দ।

কিন্তু আজকের সংকট তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনেক বেশি নির্দয়। এখানে কোনও অদৃশ্য জীবাণুর সঙ্গে যুদ্ধ নয়; এখানে আঘাত লেগেছে সরাসরি বিশ্ব শক্তির শিরায়। বিশেষ করে যেসব দেশ পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সেই দেশগুলির কাছে এই সংকট যেন অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আধুনিক বিশ্বে জ্বালানি হচ্ছে অর্থনীতির প্রতিটি স্তরের প্রাণশক্তি। সেই শক্তি-চক্রেই যখন আঘাত লাগে, তখন তা নিছক একটি অর্থনৈতিক সমস্যা হয়ে থাকে না; সমস্যাটি ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক সর্বগ্রাসী সংকটে, যা রাষ্ট্রের ভিত পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিতে পারে। এই লড়াই তাই আর শুধু টিকে থাকার নয়; এটি এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে চিনে নেওয়ার লড়াই। এ লড়াই আমাদের ভরসার, আমাদের অভ্যস্ত চিন্তার। এই বিরূপ অস্বস্তিকর কালখন্ড আমাদের ভবিষ্যৎ বিশ্বাসের এক কঠিন পরীক্ষার মুহূর্ত।

হরমুজ প্রণালি— যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়— সেখানে যাতায়াতে বিঘ্নতার অর্থ হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতির শিরায়-শিরায় এক ধরনের অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়া। এই সংকট সব দেশকে সমানভাবে আঘাত না করলেও, এর অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে ভারত-সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে— যেখানে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষা তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নেপালে মানুষ রান্নার গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে— একটি মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য সংগ্রাম যেন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। শ্রীলঙ্কাতে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সপ্তাহে একদিন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে— অর্থাৎ উৎপাদন কমিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা। পাকিস্তানে স্কুল বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে— জ্বালানি সাশ্রয় এখন শিক্ষাব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলছে। এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো আসলে একটি বৃহত্তর সংকটের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিফলন।

এই পরিস্থিতি নতুন নয়। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। উন্নত দেশগুলো ভর্তুকি দিয়ে নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পেরেছিল, কিন্তু চাপ গিয়ে পড়েছিল উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। শ্রীলঙ্কার ঋণখেলাপি হওয়া, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অস্থিরতা— সবই সেই চাপের ফল। আজকের পরিস্থিতি সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হলেও, ঝুঁকি যেন আরও গভীর।
প্রশ্ন উঠছে— কারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে? যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং যাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত, তারাই প্রথম সারিতে। পাকিস্তান ও মিসরের মতো দেশগুলো এই তালিকার শীর্ষে— পশ্চিম এশিয়ায় জ্বালানির ওপর তাদের নির্ভরতা যেমন বেশি, তেমনি উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সও তাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুদ্ধের কারণে যদি সেই অঞ্চলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়,তবে স্বাভাবিকভাবে তাদের আয় কমবে। জ্বালানির দাম বাড়লে খরচও বাড়বে— এই দ্বিমুখী চাপ তাদের অর্থনীতিকে দ্রুত সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারত কোথায় দাঁড়িয়ে? ভারত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হলেও সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। ভারতের বড় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আছে, এবং তারা জ্বালানির উৎস কিছুটা ডাইভারসিফাই করেছে— বিশেষত রাশিয়া থেকে তেল আমদানির মাধ্যমে। কিন্তু তবুও, ভারতের মোট তেল চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের ভেতরে পড়বেই।

ভারতের অর্থনীতির একটি বড় অংশ পরিবহন, কৃষি এবং শিল্পের ওপর নির্ভরশীল— যেখানে জ্বালানি একটি মৌলিক উপাদান। পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, যার প্রভাব সরাসরি পণ্যের মুল্যে গিয়ে পড়ে। আবার প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেলে সারের উৎপাদন খরচ বাড়ে— যার ফলে কৃষি খাতে চাপ তৈরি হয়। অর্থাৎ জ্বালানি সংকট শুধু শিল্প নয়, খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

এই প্রসঙ্গে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সতর্কবার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তারা ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার মাত্রা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চলে, যেখানে বিপুল জনগোষ্ঠী এখনও দারিদ্র্যের সীমানায় বাস করে— তাদের জন্য এই আশঙ্কা অতি বাস্তব ও দুর্ভাগ্যজনক!

ভারতের প্রতিবেশী বাংলাদেশের অবস্থাও খুব ভিন্ন নয়। তাদের অর্থনীতি তৈরি পোশাকশিল্পনির্ভর, যা জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমবে, এবং বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে। অর্থাৎ, উদ্ভুত সংকট এই অঞ্চলের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

তবে সব দেশ সমানভাবে ঝুঁকিতে নেই। যেমন থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর শক্তিশালী আর্থিক কাঠামো এবং কৌশলগত মজুত রয়েছে। ভারতও সেই দিক থেকে কিছুটা এগিয়ে— কিন্তু এর মানে এই নয় যে ঝুঁকি নেই। বরং বলা যায়, ভারত হয়তো সংকট সামলাতে পারবে, কিন্তু তার জন্য অন্যান্য খাতে খরচ কমাতে হতে পারে— যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সমাজে পড়বে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এই সংকট যুদ্ধ শেষ হলেই শেষ হবে না। জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল হতে সময় লাগে, সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন করতে সময় লাগে এবং দাম স্বাভাবিক হতে আরও বেশি সময় লাগে। অর্থাৎ, যুদ্ধ থেমে গেলেও সংকটের ছায়া দীর্ঘস্থায়ী হবে।

আমরা অনেকেই ভাবছিলাম— এটি এআই-এর যুগ, প্রযুক্তিই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কিন্তু বাস্তবতা আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জ্বালানি নিরাপত্তাই এখনও রাষ্ট্রের মূল শক্তি। প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খাদ্যের ভিত্তি ছাড়া কোন অর্থনীতি টেকসই হতে পারে না।

তাই আমাদের সামনে এখন যে মৌলিক প্রশ্নটি মাথা চাড়া দিয়েছে সেটি হচ্ছে— কীভাবে আরও শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তৈরি করা যায়? কীভাবে জ্বালানির উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করা যায়? কীভাবে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো যায়? এবং সবচেয়ে বড় কথা— কীভাবে একটি সহনশীল অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা যায়, যা বৈশ্বিক ধাক্কা সামলেও টিকে থাকতে পারে?

হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা আমাদের একটি কঠিন সত্য শিখিয়ে দিচ্ছে— বিশ্ব এখন আর আলাদা আলাদা দ্বীপ নয়; বিশ্বব্যবস্থা এখন একটি এরূপ আন্তঃনির্ভরশীল জাল, যেখানে এক প্রান্তের কম্পন অন্য প্রান্তে ঝড় তোলে। সেই ঝড়ে সবচেয়ে বেশি কম্পন সৃষ্টি হয় আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর। ভারতের মতো একটি বড় অর্থনীতিও এই বাস্তবতা থেকে মুক্ত নয়। সর্ববৃহৎ জনসংখ্যার দেশ হওয়াতে ভারতের দায়িত্ব আরও বেশি, কারণ তার স্থিতিশীলতা গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।