ফুটবল বিশ্বকাপ

২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর আগেই এমন কিছু ঘটনা সামনে এসেছে যা কোনোভাবেই একটি বিশ্বমানের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সঙ্গে মানানসই নয়। ফুটবল বিশ্বকাপ মানে শুধু খেলা নয়— এটি এক আন্তর্জাতিক উৎসব, যেখানে জাতি, ভাষা, রাজনীতি সবকিছু সাময়িকভাবে পেছনে সরে যায়। কিন্তু এবারের প্রস্তুতি পর্বে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা এই আদর্শকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
একজন সোমালি রেফারি, ওমর আর্তান, যিনি ফিফার দ্বারা নির্বাচিত, তাঁকে মিয়ামির বিমানবন্দরে আটকে দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই ‘নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ’-এর কথা বলা হয়েছে। একইভাবে ইরানের ক্ষেত্রে দেখা গেল, তাদের টিকিট বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে, শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভিসা দেওয়া হয়নি, ফলে সমর্থকেরা কার্যত তাদের দলের খেলা দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সেনেগালের ফুটবলারদের বিমানবন্দরে নামার পর তল্লাশি করা হয়েছে, উজবেকিস্তানের দলকে বাস থেকে নামিয়ে প্রকাশ্যে তল্লাশি চালানো হয়েছে। এই ঘটনাগুলি শুধু প্রশাসনিক কড়াকড়ি নয়, এগুলি সম্মানহানির ইঙ্গিত বহন করে।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন এই বাছবিচার? কেন একেকটি দল বা ব্যক্তিকে আলাদা করে এমন আচরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে? এই প্রশ্নই তুলেছেন উজবেকিস্তানের কোচ ফাবিও কানাভারো, ‘শুধু আমাদের সঙ্গেই কেন?’ তাঁর প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।
বিশ্বকাপ আয়োজনের মূল চেতনা হল উন্মুক্ততা— সব দেশের মানুষকে স্বাগত জানানো, খেলাকে একটি সর্বজনীন ভাষা হিসেবে তুলে ধরা। কিন্তু যখন একটি আয়োজক দেশ ভিসা, নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক সম্পর্কের অজুহাতে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে, তখন সেই চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে যখন শোনা যায় যে, কিছু দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে বা কোনও কোনও দেশের নাগরিকদের জন্য প্রবেশ আরও কঠিন করে তোলা হয়েছে, তখন বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।
অবশ্য ইতিহাস বলছে, এইসব বিতর্ক সত্ত্বেও বিশ্বকাপের আকর্ষণ কমে না। ১৯৯৪ সালে আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ নিয়ে শুরুতে সংশয় ছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, ফুটবল সেখানে তেমন জনপ্রিয় নয়, দর্শক আসবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, দর্শকসংখ্যার রেকর্ড তৈরি হল সেখানে। স্টেডিয়াম ভরে উঠল, উৎসবের আবহ তৈরি হল। একইভাবে কাতার বিশ্বকাপের আগে মানবাধিকার নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয়েছিল, কিন্তু খেলা শুরু হতেই সেই বিতর্ক অনেকটাই আড়ালে চলে যায়।
তাই এ কথাও সত্য, শেষ পর্যন্ত ফুটবলই জয়ী হয়। মানুষ খেলা দেখতে যাবে, স্টেডিয়াম ভরবে, টেলিভিশনের সামনে কোটি কোটি দর্শক বসবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে প্রাক-প্রস্তুতির সমস্যাগুলি উপেক্ষা করা উচিত। বরং এই ঘটনাগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি বিশ্বকাপ সফল করার জন্য শুধু পরিকাঠামো বা প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়— প্রয়োজন মানসিক প্রস্তুতি, গ্রহণযোগ্যতা এবং সহনশীলতা।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল— এই ধরনের হস্তক্ষেপ যদি চলতেই থাকে? যদি প্রতিনিয়ত নতুন করে কোনও দল বা ব্যক্তিকে সমস্যার মুখে পড়তে হয়? প্রতিটি ঘটনা একটু একটু করে যদি এই অনুভূতিকে আঘাত করে, যা আসলে বিশ্বকাপের প্রাণ: এই বিশ্বাস যে ফুটবল সবার, এটি কোনও এক দেশের নয়।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে, তখন খেলাধূলা একটি বিরল ক্ষেত্র যেখানে মানুষ একত্রিত হতে পারে। সেখানে যদি রাজনীতি প্রবেশ করে, যদি সন্দেহ ও বিভাজন জায়গা করে নেয়, তবে সেই ঐক্যের সম্ভাবনা নষ্ট হয়।
বিশ্বকাপ দেখতে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসছে, দলগুলি প্রস্তুত। এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আয়োজক দেশের— তারা কি এই বিশ্বকে সত্যিই স্বাগত জানাতে পারবে? নাকি নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই উৎসবের আনন্দকে ম্লান করে দেবে?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ— বিশ্বকাপ কি সবার জন্য, নাকি কিছু মানুষের জন্য? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ইতিহাসে কীভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।