আর্থিক বঞ্চনা

ফাইল চিত্র

ন্যায্য পাওনা থেকে দীর্ঘদিন বাংলাকে বঞ্চিত করে চলেছে কেন্দ্র। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে বহুবার সোচ্চার হয়েছেন। তবুও কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ আচরণের কোনও পরিবর্তন হয়নি। কেন্দ্রীয় বরাদ্দ সঠিক খাতে ব্যহার না করা এবং পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করতে না পারার অভিযোগ উঠেছে বেশ কিছু রাজ্যের বিরুদ্ধে। সেই তালিকায় রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলি। উল্লেখ্য, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি বরাদ্দ অর্থ খরচ করতে না পারলেও তাদের বরাদ্দ বছর বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু বাংলা, তামিলনাড়ু, কেরলের মতো বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলিতে প্রাপ্য বরাদ্দও আটকে দেওয়া হচ্ছে। মনরেগা (একশো দিনের কাজ), আবাস যোজনার মতো প্রকল্পেও গত তিন বছর ধরে বাংলাকে কোনও বরাদ্দ করা হয়নি। বাংলার আর্জিকে দিনের পর দিন বঞ্চনা করে চলেছে কেন্দ্রের মোদী সরকার।
কেন্দ্রীয় পঞ্চায়েতিরাজ মন্ত্রকে জমা দেওয়া ‘ডিমান্ডস ফর গ্রান্টস’ রিপোর্টে গ্রামোন্নয়ন এবং পঞ্চায়েতিরাজ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি জানিয়েছে, উল্লিখিত রাজ্যগুলিতে এই অর্থ খোলা জায়গায় শৌচকার্য বন্ধ পানীয় জল সরবরাহ ইত্যাদি কাজে খরচ করা যেত। সংবিধানে উল্লেখিত ২৯টি ক্ষেত্রে এই অর্থ ব্যবহার করা হয়। তার মধ্যে বাড়ি তৈরি, মাছ চাষ, বৃক্ষসৃজন, দারিদ্র দূরীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলি রয়েছে। পঞ্চায়েত নিয়ে প্রবীণ কংগ্রেস সাংসদ সপ্তগিরি শঙ্কর উলাকার নেতৃত্বাধীন স্থায়ী কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলি কেন্দ্রের বরাদ্দ অর্থ খরচই করতে পারেনি।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পঞ্চায়েত রয়েছে উত্তরপ্রদেশে। দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্যে মোট ৫৯ হাজার 889টি পঞ্চায়েত থাকলেও ৪৫ শতাংশ টাকা খরচ করতে পারেনি যোগী সরকার। রিপোর্টে বলা হয়েছে, শুরুতে উত্তরপ্রদেশের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩,৬০৭.৮২ কোটি টাকা। পরে বরাদ্দ করা হয় অতিরিক্ত ৩,৭০৫.৩৫ কোটি টাকা। ফলে রাজ্যটি কেন্দ্র থেকে মোট পায় ৭,৩৭৩.১৭ কোটি টাকা। যদিও খরচ হয়েছে মাত্র ৪,০৩০.৫৩ কোটি টাকা। (অর্থাৎ ৩,২৮২.৬৫ কোটি টাকা খরচ করতে পারেনি যোগী সরকার।

একইভাবে আরেকটি বিজেপি শাসিত ডাবল ইঞ্জিনের মহারাষ্ট্র সরকার মোট ৭,২৭৬.৭৮ কোটি টাকার মধ্যে ৫০২৩.৬৮ কোটি টাকা খরচ করতে পারেনি। গুজরাতের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ৩,১৯৫.৭১ কোটি টাকা। পরে অতিরিক্ত বরাদ্দ করা হয় আরও ১৫৮৭.০৬ কোটি টাকা। যদিও গুজরাত সরকার খরচ করেছে মাত্র ১৭২৮.৭৭ কোটি টাকা। মধ্যপ্রদেশের প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ১৪৫৭.২০ কোটি টাকা। পরে বরাদ্দ করা হয় আরও ২৬০১.১৮ কোটি টাকা। যদিও তারা খরচ করেছে মাত্র ১৪৩৫.৩০ কোটি টাকা।


কেন্দ্রীয় অর্থ ব্যয় না করার ফলে স্থানীয় স্তরের নানা উন্নয়নমূলক প্রকল্প থমকে রয়েছে। রাজ্যের তরফে নিম্নমানের পরিকল্পনার কারণেই কেন্দ্রীয় বরাদ্দ খরচ হচ্ছে না। ২০২৩-২৪ সালের রিপোর্টে অর্থ বরাদ্দ করার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব, কেন্দ্রের তরফে টাকা দিতে দেরি করা, স্বচ্ছতায় ঘাটতি এবং অগ্রাধিকারের তালিকায় না থাকা ক্ষেত্রগুলিতে নজর দেওয়ার বিষয় নিয়েও সংসদীয় স্থায়ী কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, বরাদ্দ করা অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হয়েছে অগ্রাধিকারের তালিকায় না থাকা ক্ষেত্রগুলিতে। উদাহরণ হিসেবে কমিটির তরফে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক খরচ হিসেবে উল্লেখযোগ্য রকম অর্থ ব্যয় করেছে বিজেপি শাসিত রাজ্য মধ্যপ্রদেশ। বেশ কয়েক মাস ধরে বিহার এবং রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলিতে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক বরাদ্দ দেরিতে পাঠিয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের তর্ফে রাজ্যে সঠিক সময়ে বরাদ্দ পাঠানোর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চালু করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। প্রস্তাব এবং সুপারিশে রাজ্যগুলির তরফে পর্যাপ্ত অঙ্কের অর্থ খরচে উৎসাহ দিতে পারফরম্যান্সের উপর ভিত্তি করে ইনসেনটিভ ব্যবস্থা চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা, গুজরাতে আর্থিক হিসেবনিকেশ সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে জানিয়েছে কমিটি। রিপোর্টে বলা হয়েছে, গুজরাতে এই ধরনের ১০ হাজার ১২৭টি ঘটনা রয়েছে। মধ্যপ্রদেশে ৪ হাজার ২১৫টি, উত্তরপ্রদেশে ৪ হাজার ৯৯৫টি এবং ওড়িশায় ৩ হাজার ৯৭টি এই ধরনের ঘটনা নজরে পড়েছে। এছাড়াও নিকাশি, পানীয় জলের মতো অত্যাবশ্যকীয় খাতে দেওয়া অর্থও অন্য খাদে খরচ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন অডিট রিপোর্টে উল্লেখ আছে।