এফসিআরএ সংশোধনী বিল

Image: AI নির্মিত

বিদেশি অনুদান ও অর্থের প্রবাহের উপর নজরদারি রাখা যে কোনও দায়িত্বশীল সরকারেরই কর্তব্য। বিদেশ থেকে আসা অর্থ কোন সংস্থা পাচ্ছে, কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করছে এবং সেই অর্থ দেশের আইন ও স্বচ্ছতার নিয়ম মেনে খরচ হচ্ছে কি না— এগুলি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। সেই দিক থেকে বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার উদ্যোগকে অস্বাভাবিক বলা যায় না। বরং সময়ের সঙ্গে আইনকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজন থাকতেই পারে।

কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা জরুরি যে, বিদেশি অনুদান গ্রহণকারী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সন্দেহের চোখে দেখা যায় না। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সমাজসেবী সংগঠন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি অনুদানের সাহায্যে জনকল্যাণমূলক কাজ করে আসছে। তাদের কাজের স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি অবশ্যই পরীক্ষা করা দরকার, কিন্তু সেই পরীক্ষার নামে যেন প্রকৃত সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলি অযথা হয়রানির শিকার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

এই জায়গাতেই ২০২৬ সালের বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ সংশোধনী বিলটি নিয়ে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে, সেগুলি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। সবচেয়ে স্বস্তির বিষয়, কেন্দ্রীয় সরকার বিতর্কিত বিষয়গুলিকে সরাসরি পাশ করিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসাবেই দেখা উচিত। সংসদীয় গণতন্ত্রে কোনও গুরুত্বপূর্ণ আইন নিয়ে মতভেদ তৈরি হলে আরও আলোচনা, পরীক্ষা ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং সেটিই গণতান্ত্রিক পরিণতিবোধের পরিচয়।

প্রস্তাবিত আইনের কয়েকটি বিধান নিয়ে মূল আপত্তি এখানেই। কোনও প্রতিষ্ঠানের এফসিআরএ-রেজিস্ট্রেশন নবীকরণ না হওয়া, স্বেচ্ছায় রেজিস্ট্রেশন সমর্পণ করা, নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া বা টানা দু’বছর কার্যত বন্ধ থাকার মতো পরিস্থিতিতে সেই প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি বা পরিকাঠামোর উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে সেই সম্পত্তি তৈরিতে বিদেশি অর্থের কোনও ভূমিকা থাকলে এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। প্রশ্ন হল, এমন একটি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে যথেষ্ট আইনি সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে কি না।


কারও লাইসেন্স বা রেজিস্ট্রেশন নবীকরণে সমস্যা হলেই তার সম্পত্তি নিয়ে নেওয়ার মতো ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের ভূমিকা কতটা হবে এবং স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ কতটা থাকবে। রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও যথাযথ প্রক্রিয়া ও আপিলের সুযোগ থাকা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত।

এই কারণেই যৌথ সংসদীয় কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কমিটি যদি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য শোনে এবং আইনের উদ্দেশ্য ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারে, তা হলে সংশোধনীটি আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। সরকারের উদ্দেশ্য যদি হয় বিদেশি অর্থের অপব্যবহার বন্ধ করা, তবে সেই উদ্দেশ্য নিয়ে দ্বিমত থাকার কারণ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে সৎ ও আইন মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাভাবিক কাজকর্ম যাতে ব্যাহত না হয়, সেটিও আইনের মধ্যে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের আশ্বাস দিয়েছেন যে, প্রস্তাবিত আইনের কোনও পশ্চাৎমুখী প্রয়োগ হবে না। এই আশ্বাসও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের এফসিআরএ-রেজিস্ট্রেশন কোনও কারণে নবীকরণ হয়নি বা যাদের আবেদন প্রক্রিয়াধীন, তাদের ক্ষেত্রে অতীতের অবস্থাকে কেন্দ্র করে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া উচিত নয়। আইন কার্যকর হওয়ার আগের ঘটনা নিয়ে কোনও প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়া হলে তা ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণার সঙ্গেও সংঘাত তৈরি করতে পারে।

একইভাবে, কোনও প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন নবীকরণের আবেদন বিবেচনাধীন থাকা অবস্থাতেও তার সম্পত্তি দখল বা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রাখা হলে তা অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই ধরনের বিধান পুনর্বিবেচনা করা দরকার। কারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিলম্ব বা কোনও প্রযুক্তিগত ত্রুটির দায়ে একটি প্রতিষ্ঠানের বহু বছরের কাজ, সম্পত্তি এবং জনসেবামূলক পরিকাঠামো হঠাৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেতে পারে না।

প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে জবাবদিহি ও বিচারব্যবস্থার সুরক্ষাও। একটি ভালো আইন শুধু রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ায় না, নাগরিকের আস্থাও বাড়ায়। এই সংশোধনী বিলের ক্ষেত্রেও সেটিই হওয়া উচিত চূড়ান্ত লক্ষ্য।