শিক্ষা কেবল পাঠ্যপুস্তকের বিষয় নয়, তা একটি সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। সেই পুরনো সত্যকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট। শিশুদের বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ১২(১)(সি)-র বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের কড়া পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে শীর্ষ আদালত। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির শিশুদের জন্য বেসরকারি অনুদানহীন স্কুলে ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষণকে আদালত যে ‘জাতীয় মিশন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে, তা নিছক আইনি ভাষ্য নয়, এ এক গভীর সাংবিধানিক বার্তা।
আদালতের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি স্পষ্ট ধারণা– সামাজিক বৈষম্য ভাঙার জন্য বিদ্যালয়ই সবচেয়ে কার্যকর ক্ষেত্র। যদি ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সমাজের বিভাজন প্রতিফলিত হয়, তবে সমতার প্রতিশ্রুতি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই কারণেই আরটিই আইন বেসরকারি স্কুলগুলিকে বাধ্য করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের ভর্তি নিতে। সামাজিক মেলবন্ধনের সূচনা যদি শৈশবে না হয়, তবে নাগরিক সমতা কখনোই বাস্তব রূপ পায় না।
এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, ধারা ১২(১)(সি) কোনও দয়া বা কল্যাণমূলক প্রকল্প নয়। এটি সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদের সমতা ও ২১এ অনুচ্ছেদের শিক্ষার অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আদালত কার্যত এ কথাই বলেছে— যদি শিক্ষার দরজায়ই বৈষম্যের প্রাচীর তোলা থাকে, তবে সংবিধানের মৌলিক অধিকারগুলির অর্থ শূন্য হয়ে যায়।
এই রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘ভ্রাতৃত্ব’-এর ধারণাকে নতুন গুরুত্ব দেওয়া। সাধারণত ভ্রাতৃত্বকে আমরা নৈতিক বা আদর্শগত মূল্য হিসেবে দেখি, আইনি বাস্তবতার সঙ্গে যার যোগ খুব কম। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট এ ক্ষেত্রে ভ্রাতৃত্বকে সাংবিধানিকভাবে কার্যকর এক নীতিতে রূপ দিয়েছে। ধারা ১২(১)(সি)-কে ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত করে আদালত বুঝিয়ে দিয়েছে, সমাজের বিভিন্ন স্তরের শিশুদের একসঙ্গে পড়াশোনা করার সুযোগ তৈরি করা রাষ্ট্রের আইনি দায়িত্ব।
এই আদর্শগত অবস্থানের পেছনে রয়েছে এক কঠোর বাস্তবতা। আরটিই আইন কার্যকর হওয়ার পনেরো বছরেরও বেশি সময় পরে দেখা যাচ্ছে, বহু রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই ২৫ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যত উপেক্ষিত। দিল্লির ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষেই বেসরকারি অনুদানহীন স্কুলে ৩৩ হাজার ২১২টি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে ৩ হাজার ৫০৬টি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থানেও একই চিত্র। শুধু ভর্তি না হওয়াই নয়, বহু ক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা স্কুলে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে— নিয়মবহির্ভূত ফি আদায়, আলাদা বসানো বা বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ নতুন নয়।
আদালত এই ব্যর্থতার জন্য মূলত প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত দুর্বলতাকেই দায়ী করেছে। বাধ্যতামূলক নিয়মের অভাব, কেবল পরামর্শনির্ভর নির্দেশিকা, অস্বচ্ছ ভর্তি প্রক্রিয়া এবং দুর্বল অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাই স্কুলগুলিকে দায় এড়ানোর সুযোগ দিয়েছে। এই কারণেই সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যগুলিকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে— আরটিই আইনের ধারা ৩৮ অনুযায়ী কার্যকর নিয়ম তৈরি করতে হবে, শিশু অধিকার কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে, ভর্তি সংক্রান্ত মানদণ্ড প্রকাশ্যে আনতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অভিযোগ প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
তবে এটাও স্পষ্ট, আদালতের নির্দেশ যতই দূরদর্শী হোক না কেন, প্রশাসনিক সদিচ্ছা ছাড়া তার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। শিক্ষা দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ— সব পক্ষকেই বুঝতে হবে, এই আইন মানা কোনও বোঝা নয়, বরং একটি অধিক সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য বিনিয়োগ।
সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ আমাদের আবার সেই মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, আমরা কি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যা সমাজের বিভাজনকে আরও গভীর করে, না কি এমন এক ব্যবস্থা, যা ছোটবেলা থেকেই সমতা ও সহাবস্থানের বীজ বপন করে? সংবিধানের উত্তর স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, রাষ্ট্র ও সমাজ সেই উত্তরের প্রতি কতটা সৎ থাকে।