বিশ্ব জ্বালানি বাজার আবার অস্থিরতার মুখে। ওপেকের পূর্বাভাস, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সতর্কবার্তা এবং পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা— সব মিলিয়ে স্পষ্ট যে, আগামী মাসগুলিতে তেলের বাজার আরও চাপে পড়তে চলেছে। চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির ওপর, বিশেষত ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল অনিশ্চয়তা। পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা প্রশমিত হলেও তেল সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে। এমনকি দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান হলেও উৎপাদন বৃদ্ধি, মজুত পুনর্গঠন এবং বাণিজ্যিক রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। এই ব্যবধানেই তেলের দাম বাড়ার প্রবণতা বজায় থাকবে।
ভারতের মতো দেশে এর প্রভাব বহুস্তরীয়। ইতিমধ্যেই জ্বালানির দাম বৃদ্ধির চাপ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হচ্ছে। যদিও সরকার সাধারণত এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ধাপে ধাপে কার্যকর করে, তবুও এর প্রভাব অনিবার্যভাবে ভোক্তা ব্যয়কে প্রভাবিত করে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, যার ফলে খাদ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে থাকে।
আরও বড় সমস্যা হল সার ও প্লাস্টিক শিল্পে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব। কৃষিক্ষেত্রে সার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং এর দাম বৃদ্ধি সরাসরি কৃষকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে যদি অনিশ্চিত মৌসুমি বৃষ্টির সম্ভাবনা যুক্ত হয়, তাহলে খাদ্য উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে প্লাস্টিকের মতো পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের দাম বাড়লে তা শিল্প ও দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। ফলে সামগ্রিকভাবে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের অর্থনীতির একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যাকে বলা যায় ‘বৃদ্ধি বনাম মুদ্রাস্ফীতি’ দ্বন্দ্ব। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সুদের হার বাড়াতে হতে পারে, অন্যদিকে বেশি সুদের হার বিনিয়োগ ও চাহিদা কমিয়ে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে ধীর করে দেয়। ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৈদেশিক খাতের চাপ। তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে, যার ফলে চলতি হিসাব ঘাটতি বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ কমে গেলে বা মূলধন দেশ ছাড়লে মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে টাকার দুর্বলতা এই ঝুঁকিরই প্রতিফলন। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে হস্তক্ষেপ করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তবে এই সংকট নতুন নয়। গত এক দশকে ভারত একাধিক জ্বালানি-সংকট ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিবারই সংকট মোকাবিলায় কিছুটা সাফল্য দেখানো হয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনা। এক বা দুই অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয়তা। সৌর, বায়ু এবং অন্যান্য সবুজ শক্তির উপর বিনিয়োগ বাড়ালে ভবিষ্যতে আমদানি-নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও বাস্তবতা। ভর্তুকি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে আকস্মিক বড় ধাক্কা না লাগে, আবার অর্থনীতির উপর অতিরিক্ত চাপও না পড়ে। বর্তমান জ্বালানি সংকট ভারতের জন্য একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে তেমনই একটি সুযোগ। এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে যদি দীর্ঘমেয়াদি নীতি পরিবর্তন করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক ধাক্কা মোকাবিলা করা সহজ হবে।