ভারতের বর্তমান বিধানসভা নির্বাচনী পর্ব এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। দক্ষিণে তামিলনাড়ু এবং পূর্বে পশ্চিমবঙ্গ— এই দুই রাজ্যে ভোটের লড়াই শুধু সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়, বরং রাজনৈতিক বয়ানের দিক থেকেও এক গভীর তাৎপর্য বহন করছে। দুই রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হলেও, উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে ক্ষমতা, পরিচয় এবং জনকল্যাণমূলক রাজনীতির এক জটিল মিশ্রণ।
তামিলনাড়ুতে গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে দুটি প্রধান দ্রাবিড় শক্তিকে ঘিরে— ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে। এই দ্বিমেরু রাজনীতির মধ্যে অন্যান্য দলগুলি প্রায়শই সহযোগী শক্তি হিসেবেই অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে নতুন উপাদান হিসেবে উঠে এসেছে তামিল ভেত্রি কাঝাগম, যার নেতৃত্বে রয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয়। তাঁর এই প্রবেশ রাজনৈতিক সমীকরণে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে— বিশেষত ভোটের ভাগাভাগির ক্ষেত্রে।
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন তাঁর প্রচারে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে চেয়েছেন— ‘তামিলনাড়ু বনাম দিল্লি’। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিজেপিকে রাজ্যের বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং পালানিস্বামীর নেতৃত্বাধীন জোটকে সেই শক্তির সহায়ক বলে তুলে ধরছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি, বিশেষত জনসংখ্যাভিত্তিক আসন পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা বা নারীদের সংরক্ষণ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ, এই প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। স্ট্যালিনের দাবি, তাঁর সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলি সম্পূর্ণ করতে আরও একটি মেয়াদ প্রয়োজন।
অন্যদিকে, পালানিস্বামী দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ডিএমকে সরকারের বিরুদ্ধে সরব। তাঁর বক্তব্য, জোট রাজনীতিকে অজুহাত করে প্রশাসনিক ব্যর্থতা আড়াল করা হচ্ছে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে বিজয়ের দল কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তিনি হয়তো নিজের আসনে জয়ী হতে পারেন, কিন্তু বৃহত্তর ফলাফলে তাঁর ভূমিকা ‘ভোট-কাটা’ হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন হলেও সমানভাবে উত্তেজনাপূর্ণ। এখানে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস, যার নেতৃত্বে রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এখনও একটি কাঠামোগত সুবিধা ভোগ করছে। এই সুবিধার মূল ভিত্তি হলো একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প— যেমন লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথী এবং দুয়ারে সরকার। বিশেষ করে মহিলা ভোটার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমর্থন তৃণমূল কংগ্রেসের শক্তিকে সুদৃঢ় করেছে।
তবে বিজেপি গত কয়েক বছরে রাজ্যে নিজেদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। তারা মানুষের একাংশের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ এবং অনুপ্রবেশের ইস্যুকে সামনে এনে রাজনৈতিক লড়াইকে তীব্র করেছে। পাশাপাশি, মহিলাদের জন্য আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে, যা তৃণমূল কংগ্রেসের সামাজিক সুরক্ষা নীতির সরাসরি পাল্টা হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
এই লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবার বামফ্রন্টের এবং কংগ্রেসের পুনরুত্থানের চেষ্টাও অনেকটা প্রভাব ফেলবে। বিশেষত উত্তরবঙ্গে বামেদের সক্রিয়তা বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় যদি বাম-কংগ্রেস প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্যও তা মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। একইভাবে এআইএমআইএম (মিম)-এর উপস্থিতিও সংখ্যালঘু ভোটের বিভাজন ঘটাতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই দুই রাজ্যের নির্বাচন শুধু সংখ্যার লড়াই নয়— এটি রাজনৈতিক কৌশল, বয়ান নির্মাণ এবং ভোটার মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম পরীক্ষাও বটে।
তামিলনাড়ুতে যেখানে আঞ্চলিক পরিচয় বনাম কেন্দ্রের প্রভাবের প্রশ্ন মুখ্য, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে কল্যাণমূলক রাজনীতি বনাম পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণের সংঘর্ষ স্পষ্ট।ফলাফল যাই হোক না কেন, এই নির্বাচনের একটি বড় শিক্ষা হলো— ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতি এখনও শক্তিশালী, কিন্তু তার ভেতরে নতুন শক্তির উত্থান, জোটের পুনর্বিন্যাস এবং ভোটারদের পরিবর্তিত প্রত্যাশা ভবিষ্যতের রাজনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে। এই পরিবর্তনের স্রোতকে বোঝাই আগামী দিনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মূল চাবিকাঠি।