কেরলে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন

প্রতীকী চিত্র

কেরলে বিপুল জয়ের উচ্ছ্বাস এখন ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের কারণে। মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে ঐকমত্যে পৌঁছতে না পারা এবং সেই নিয়ে প্রকাশ্য শক্তিপ্রদর্শন— এই দুইয়ের যুগপৎ অভিঘাতে ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ)-এর রাজনৈতিক সাফল্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দিল্লিতে দলীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে টানা বৈঠকেও যখন সমাধান মিলল না, তখন স্পষ্ট যে সমস্যাটি কেবল নেতৃত্ব বাছাইয়ের নয়, বরং দলীয় সংস্কৃতি ও শৃঙ্খলার গভীরে প্রোথিত।

মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে সামনে রয়েছেন তিনজন— ভি ডি সতীশন, কে সি বেণুগোপাল এবং রমেশ চেন্নিতালা। প্রত্যেকেই নিজের নিজের যুক্তিতে অনড়। বেণুগোপাল দাবি করছেন বিধায়কদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন, চেন্নিতালা তুলে ধরছেন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আর সতীশন জোর দিচ্ছেন জনসমর্থন ও ইউডিএফ শরিকদের আস্থার উপর। এই তিনটি যুক্তিই রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— দল কি এই বহুমুখী দাবির মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারছে?

এই অচলাবস্থার মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল রাস্তায় নেমে পড়া কর্মী-সমর্থকদের বিক্ষোভ ও শক্তিপ্রদর্শন। কংগ্রেসের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দল, যার ইতিহাসে সাংগঠনিক শৃঙ্খলার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, সেখানে এই ধরনের ‘ফ্লেক্স-ব্যানার রাজনীতি’ নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। দলীয় নেতৃত্বের আহ্বানে যদিও তিন প্রার্থীই যৌথভাবে কর্মীদের শান্ত থাকার আবেদন জানিয়েছেন, তবু এই ঘটনায় যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়।


কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতা রাহুল গান্ধীর ক্ষোভও এই প্রেক্ষিতে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য— এই ধরনের প্রকাশ্য শক্তিপ্রদর্শন জনমতের প্রতি অসম্মান— আসলে বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। কেরলের মানুষ যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন, তা কোনও ব্যক্তির জন্য নয়, বরং একটি বিকল্প শাসনের প্রত্যাশায়। সেই প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘হাই কমান্ড সংস্কৃতি’। কংগ্রেস বরাবরই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। কারণ, যে কোনও সিদ্ধান্তই দলের একাংশকে অসন্তুষ্ট করবে। বেণুগোপালকে বেছে নিলে সতীশন-চেন্নিতালা শিবিরে অসন্তোষ বাড়বে, আবার সতীশনকে বেছে নিলে বিধায়কদের একাংশের মতামত উপেক্ষিত হবে। চেন্নিতালাকে বেছে নেওয়া হলে ‘প্রজন্ম পরিবর্তন’-এর বার্তা ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

এই জটিলতার মধ্যেই উঠে আসছে আরেকটি প্রশ্ন— কেরলে কংগ্রেস কি নতুন নেতৃত্বের দিকে এগোবে, নাকি অভিজ্ঞতার উপরই ভরসা রাখবে? সতীশন তুলনামূলকভাবে নতুন মুখ হিসেবে জনমানসে জায়গা করে নিয়েছেন, বিশেষ করে বিরোধী দলনেতা হিসেবে তাঁর আক্রমণাত্মক ভূমিকা তাঁকে জনপ্রিয় করেছে। অন্যদিকে, বেণুগোপাল দলের কেন্দ্রীয় সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। চেন্নিতালা আবার অভিজ্ঞতার নিরিখে সবচেয়ে এগিয়ে।

এই তিনটি ধারা— জনসমর্থন, সাংগঠনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা— একটি দলের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কংগ্রেসের বর্তমান সংকট হল, এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। যদি এই ভারসাম্য নষ্ট হয়, তাহলে তা কেবল কেরলেই নয়, জাতীয় স্তরেও দলের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলবে।

সুতরাং কেরলের এই পরিস্থিতি কংগ্রেসের জন্য এক ধরনের ‘লিটমাস টেস্ট’। তারা কি অভ্যন্তরীণ মতভেদ সামলে ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারবে, নাকি বিভাজনের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়বে— তার উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ। দ্রুত এবং গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তই এখন একমাত্র পথ। নচেৎ, যে জয় এত কষ্টে অর্জিত হয়েছে, তা হাতছাড়া হতে সময় লাগবে না।