নির্বাচন কমিশন: রক্ষাকবচ না আস্থাকবচ?

প্রতীকী চিত্র

দেশের গণতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর হল অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নাতীত হওয়াই কাম্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আজ দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ-পদ্ধতি এবং তাঁদের জন্য দেওয়া আইনি রক্ষাকবচ— এই দু’টি বিষয় ঘিরেই তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিতর্ক এতটাই গভীর যে তা গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। গণতন্ত্রের পক্ষে এর থেকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি আর কী হতে পারে?

দু’বছর আগে মোদী সরকার যে ‘মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন’ প্রণয়ন করেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে দু’টি মৌলিক প্রশ্ন। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে যে কমিটি গঠিত হয়েছে, সেখানে দেশের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া কেন? দ্বিতীয়ত, কমিশনারদের জন্য আজীবন ফৌজদারি আইনি রক্ষাকবচ দেওয়া আদৌ সংবিধানসম্মত কি না। এই দুই প্রশ্নই সরাসরি নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।
সরকারের যুক্তি, এই রক্ষাকবচ কমিশনারদের কাজের শর্তের অঙ্গ। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— ফৌজদারি প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি কি আদৌ ‘কাজের শর্ত’-এর মধ্যে পড়ে? দেশের রাষ্ট্রপতি কিংবা রাজ্যপালদেরও যেখানে এমন পূর্ণ রক্ষাকবচ নেই, সেখানে নির্বাচন কমিশনারদের জন্য এমন সুবিধা কি অতিরিক্ত নয়? বিরোধীদের অভিযোগ, এই আইনি সুরক্ষার জোরেই কমিশনের উপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে এবং কমিশন শাসক দলের স্বার্থে কাজ করছে, এমন ধারণা জনমনে গড়ে উঠছে।

এই ধারণা যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, তা সরকার আজ আর জোর দিয়ে বলতে পারছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একের পর এক নির্বাচনে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনী বিধিভঙ্গের অভিযোগে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কমিশনের নীরবতা চোখে পড়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে অভিযোগ উঠছে, তা কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার অংশ হয়ে থাকলে এত উদ্বেগের বিষয় হত না। কিন্তু যখন সেই অভিযোগ আদালতে পৌঁছয়, তখন তা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে।


সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের মন্তব্য এই কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, এই আইনের ফলে সংবিধানের কোনও মৌলিক ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। অর্থাৎ আদালত বুঝতে চাইছে, এই রক্ষাকবচ আদৌ কমিশনের স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করছে, না কি তাকে নির্বাহী বিভাগের আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয়, এর আগেও সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থার কথা বলেছিল— যেখানে বিচারব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব থাকত। নতুন আইনে সেই নির্দেশ কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে। ফলত অভিযোগ উঠেছে, সরকার নিজের অনুকূল ব্যক্তিদের কমিশনে বসানোর পথ প্রশস্ত করছে। গণতন্ত্রে ‘ধারণা’ (perception) নিজেই একটি শক্তিশালী বাস্তবতা। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ না হলেও যেমন ক্ষতি, তেমনই ক্ষতিকর যদি মানুষের মনে সেই বিশ্বাস জন্মায় যে কমিশন নিরপেক্ষ নয়।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নির্বাচন কমিশনারদের জন্য এই রক্ষাকবচ আদৌ কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে? কমিশনের, না সরকারের? একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে রক্ষাকবচ দিয়ে শক্তিশালী করা আর তাকে রাজনৈতিক সন্দেহের ঢালের আড়ালে রাখা— এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। বর্তমান আইনের ফলে যদি কমিশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়, তবে তা দেশের গণতন্ত্রেরই ক্ষতি।

নির্বাচন কমিশন কোনও সরকারের প্রতিষ্ঠান নয়, এটি সংবিধানের প্রতিষ্ঠান। তাই তাকে নিয়ে বিতর্ক কাম্য নয়। আজ যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই আইন যাচাইয়ের দায়িত্ব নিয়েছে, তখন সরকারের উচিত অহং ত্যাগ করে আত্মসমালোচনার পথে হাঁটা। গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন নয়, তা আস্থার শাসন। সেই আস্থা ভাঙলে রক্ষাকবচ দিয়েও গণতন্ত্রকে বাঁচানো যায় না।