দিল্লির যন্তর মন্তরে সাম্প্রতিক প্রতিবাদ আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এক গভীর সংকটকে সামনে এনে দিয়েছে। নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভ স্বাভাবিক। তারা শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহি চাইছে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি। কিন্তু এই ঘটনাকে যদি আমরা শুধুমাত্র একটি পরীক্ষার সীমার মধ্যে আটকে রাখি, তাহলে বৃহত্তর সমস্যাটি আমাদের চোখ এড়িয়ে যাবে।
ভারতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসে— NEET, JEE, UPSC ইত্যাদি। কিন্তু এদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকই শেষ পর্যন্ত সুযোগ পায়। বাকি বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণীর সামনে তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়— তাদের ভবিষ্যৎ কী? তারা কি যথেষ্ট দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ পাচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অংশগ্রহণ করার জন্য? বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখনও এই চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
অনেকে মনে করেন, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু বিষয়টি এতটা সহজ নয়। গত এক দশকে কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষার অংশীদারিত্ব কমেছে— এটি অবশ্যই উদ্বেগজনক। তবে শুধু টাকা বাড়ালেই সব ঠিক হয়ে যাবে, এমন ভাবাও ভুল। শিক্ষার মান, পাঠ্যক্রমের আধুনিকীকরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর— এই সবকিছু মিলিয়েই একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষা এখন সমন্বিত দায়িত্বের ক্ষেত্র। ১৯৭৬ সালের আগে এটি ছিল রাজ্যের বিষয়, পরে তা সমবায় তালিকায় স্থান পায়। ফলে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি সম্ভব নয়। বাস্তবে দেখা যায়, এই সমন্বয়ের অভাব অনেক ক্ষেত্রেই নীতির সঠিক বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করে।
আজকের বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং বিশ্ব রাজনীতির টানাপোড়েন শ্রমবাজারকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকেও বদলাতে হবে। শুধু ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন দক্ষতা— সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমাদের বর্তমান ব্যবস্থায় এই বিষয়গুলির ওপর এখনও পর্যাপ্ত জোর নেই।
২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রে একই জোট সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তারা একাধিক ক্ষেত্রে বড় রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে সেই রকম জোরালো ও ধারাবাহিক উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায়নি। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এখানে একটি রাজনৈতিক দিকও আছে। ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় এক নতুন প্রজন্মের ভোটার সামনে আসবে— যারা বড় হয়েছে এই সরকারের আমলেই। এই তরুণরা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চাইবে। তারা বুঝতে পারছে যে শিক্ষার দুর্বলতা তাদের কর্মসংস্থান ও জীবনের মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
যন্তরর মন্তরের এই প্রতিবাদ তাই শুধুমাত্র একটি পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে নয়। এটি একটি বৃহত্তর বার্তা দিচ্ছে— শিক্ষাকে দেশের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে। সরকার যদি সত্যিই ভবিষ্যতের কথা ভাবে, তাহলে তাকে এই বার্তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।
আজকের তরুণ সমাজ আর শুধু আশ্বাসে সন্তুষ্ট নয়। তারা সুযোগ চায়, ন্যায্যতা চায়, এবং এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চায়, যা তাদের স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করবে। প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনাগুলি সেই আস্থাকে নষ্ট করে দেয়। তাই সমস্যার মূল ধরে সমাধান করতে হবে— শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার দরকার।
শেষ পর্যন্ত, একটি দেশের উন্নতি তার মানবসম্পদের ওপর নির্ভর করে। সেই মানবসম্পদ গড়ে ওঠে শিক্ষার মাধ্যমে। তাই শিক্ষা যদি শক্তিশালী না হয়, তাহলে উন্নয়নের স্বপ্নও অপূর্ণ থেকে যাবে। এখন সময় এসেছে এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে সঠিক পথে এগোনোর।
শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ আজ গভীর প্রশ্নের মুখে
Image: ANI