সম্প্রতি ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের নেতৃত্বে জাপানে ভারতের বৃহত্তম ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের সফর এই পরিবর্তনেরই একটি বড় ইঙ্গিত। ভারত-জাপান সম্পর্ক এখন আর শুধু সরকারি কূটনীতি বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জাপানের বেসরকারি সংস্থাগুলিও ভারতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখছে।
ভারতের বড় শহরগুলিতে এর চিহ্ন ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। মুম্বাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর বাজারে ইউনিক্লো, মুজি ও ওনিতসুকা টাইগারের মতো জাপানি ব্র্যান্ড দ্রুত ব্যবসা বাড়াচ্ছে। আসবাবপত্র সংস্থা নিতোরি নতুন করে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করেছে। কনভিনিয়েন্স স্টোর চেন লসনও ভারতে বড় আকারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
তবে এই আগ্রহ শুধু খুচরো বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের আর্থিক ক্ষেত্রেও জাপানি বিনিয়োগের গুরুত্ব বাড়ছে। জাপানের বৃহত্তম ব্যাঙ্ক এমইউএফজি শ্রীরাম ফাইন্যান্সে ২০ শতাংশ অংশীদারি কিনতে ৪.৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। সুমিতোমো মিৎসুই ব্যাংকিং কর্পোরেশনও ইয়েস ব্যাংকের বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার হয়েছে। অর্থাৎ জাপানি পুঁজি ভারতের শিল্প ও ভোক্তা বাজারের পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাতেও গভীরভাবে প্রবেশ করছে।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও ভারত জাপানের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। একশোরও বেশি জাপানি সংস্থা ভারতে গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার বা জিসিসি পরিচালনা করছে। গবেষণা ও উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার, কর্পোরেট পরিকল্পনা এবং অন্যান্য উচ্চ দক্ষতার কাজের জন্য ভারতীয় মেধাকে ব্যবহার করছে তারা। ভারতের বিপুল দক্ষ মানবসম্পদ এই ক্ষেত্রে বড় সম্পদ।
জাপানের এই ভারতমুখী হওয়ার পেছনে জাপানের নিজের সমস্যাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশটির জনসংখ্যা দীর্ঘদিন ধরে কমছে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারের আকারও সংকুচিত হচ্ছে। যে সংস্থাগুলি ভবিষ্যতে ব্যবসা বাড়াতে চায়, তাদের বিদেশের বড় বাজার খুঁজতেই হবে। চিন একসময় ছিল স্বাভাবিক গন্তব্য। কিন্তু এখন সেখানে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেড়েছে। আমেরিকার বাজারেও শুল্ক ও প্রতিযোগিতার সমস্যা রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের বাজার আবার ভারতের তুলনায় ছোট। ফলে বিপুল জনসংখ্যা ও দ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনীতির ভারত জাপানি সংস্থাগুলির কাছে স্বাভাবিক আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
তবে জাপান চিনকে ছেড়ে ভারতে চলে আসছে— বিষয়টি এমন নয়। চিনের সঙ্গে জাপানের শিল্প ও সরবরাহ-শৃঙ্খলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই জাপানি সংস্থাগুলির বর্তমান কৌশল মূলত ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া। অর্থাৎ চিন থাকবে, কিন্তু চিনের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ভারতসহ অন্যান্য দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে।এই পরিস্থিতিই ভারতের জন্য বড় সুযোগ।
প্রথমত, কর্মসংস্থান। জাপানি সংস্থাগুলি ভারতে কারখানা, প্রযুক্তিকেন্দ্র ও পরিষেবা প্রতিষ্ঠান তৈরি করলে সরাসরি চাকরি বাড়বে। পাশাপাশি যন্ত্রাংশ, পরিবহণ, গুদাম, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সহায়ক শিল্পেও কর্মসংস্থান তৈরি হবে। একটি বড় জাপানি প্রকল্প তাই বহু ভারতীয় ছোট ও মাঝারি সংস্থার ব্যবসার সুযোগও বাড়াতে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি ও দক্ষতা। জাপান উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, গুণমান নিয়ন্ত্রণ, অটোমেশন এবং ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতার জন্য পরিচিত। জাপানি সংস্থার সঙ্গে কাজ করলে ভারতীয় শিল্প নতুন প্রযুক্তি ও উৎপাদন পদ্ধতি শিখতে পারে। সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যান, রোবোটিক্স ও সবুজ প্রযুক্তির মতো ভবিষ্যৎ শিল্পে এই সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, ভারতের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়বে। বিদেশ থেকে পণ্য ও যন্ত্রাংশ আমদানির পরিবর্তে সেগুলির আরও বেশি অংশ যদি ভারতে তৈরি হয়, তাহলে দেশীয় শিল্পের ভিত শক্ত হবে। জাপানি সংস্থার সঙ্গে কাজ করা ভারতীয় ছোট ও মাঝারি শিল্পও আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন ও সরবরাহ-ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারবে। ভারত তখন শুধু বড় বাজার নয়, বিশ্ববাজারের জন্য উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
চতুর্থত, চিনের উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ। গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চিনের উপর ভারতের নির্ভরতা এখনও যথেষ্ট। জাপানের সঙ্গে শিল্প ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়লে বিকল্প সরবরাহ-শৃঙ্খল তৈরি হতে পারে। এটি শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা নয়, ভারতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও প্রশ্ন।
পঞ্চমত, দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি পুঁজি। জাপানি বিনিয়োগ যদি শুধু বাজার দখলের জন্য না হয়ে কারখানা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও সরবরাহ-ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি অংশগ্রহণ করে, তাহলে ভারতের শিল্পভিত্তি আরও মজবুত হবে। জাপানি ব্যাঙ্কগুলির বিনিয়োগও ভারতীয় ব্যবসা ও পরিকাঠামোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জোগান বাড়াতে পারে।
ভারত ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অবশ্য একেবারে নতুন নয়। গত এক দশকে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক যথেষ্ট গভীর হয়েছে। মুম্বই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্প তার অন্যতম প্রতীক। এখন সরকারি সহযোগিতার সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ যুক্ত হওয়াই নতুন পরিবর্তন।
তবে সুযোগের পাশাপাশি সতর্কতাও জরুরি। ভারতে জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত অনুমোদন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, করনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ। বুলেট ট্রেন প্রকল্প নিয়েও জাপানের পক্ষ থেকে বিলম্বের অভিযোগ উঠেছিল। ফলে বড় চুক্তি করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ বাস্তবে যাতে কারখানা, গবেষণাকেন্দ্র ও কর্মসংস্থানে পরিণত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন চিনকেন্দ্রিক ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা চলছে, তখন জাপানের ভারতমুখী হওয়া ভারতের সামনে এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে ভারতকে প্রমাণ করতে হবে— সে শুধু একটি বিশাল বাজার নয়, বিশ্বস্ত, স্থিতিশীল এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প-অংশীদার।
জাপানের পুঁজি, প্রযুক্তি ও শিল্প-অভিজ্ঞতা যদি ভারতের দক্ষ মানবসম্পদ ও বিশাল বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তার সুফল শুধু জাপানি সংস্থার নয়, ভারতীয় অর্থনীতিরও হবে। কর্মসংস্থান বাড়বে, উৎপাদন শক্তিশালী হবে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়বে এবং চিনের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।তাই জাপানের এই নতুন ভারত-অভিযানকে শুধু বিদেশি বিনিয়োগের খবর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ভারতের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সম্ভাবনা। এখন প্রশ্ন একটাই— ভারত কি এই সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শক্তিতে পরিণত করতে পারবে?