পৃথিবীকে আমরা বহুদিন ধরেই একটি স্থির আশ্রয় বলে ভেবে এসেছি। আমাদের জন্ম, আমাদের শহর, বহুতল অট্টালিকা, সভ্যতার বিস্তার—সবকিছু যেন এই মাটির উপরেই নিরাপদে দাঁড়িয়ে আছে বলে আমরা বিশ্বাস করতে শিখেছি। অথচ মাঝে মাঝেই পৃথিবী তার গভীর অন্তঃস্থল থেকে এমন এক ভয়ংকর সংকেত পাঠায়, যা মুহূর্তের মধ্যে মানুষের সমস্ত আত্মবিশ্বাসকে ধূলিসাৎ করে দেয়। তখন বোঝা যায়, মানুষ যতই প্রযুক্তির অহংকার করুক, প্রকৃতির সামনে সে এখনও ভীষণ অসহায়।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলাতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্প সেই নির্মম সত্যকেই আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। চলতি বছরের ২৪ জুন সন্ধ্যাবেলায় মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে পরপর দুটি প্রবল ভূমিকম্প আঘাত হানে দেশটিতে। প্রথমটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭.২, দ্বিতীয়টির ৭.৫। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এমন দ্বৈত ভূমিকম্প ইতিহাসে বিরল। বলা হচ্ছে, গত একশো বছরের মধ্যে এটি ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ভূকম্পন।
রাজধানী কারাকাস এবং আশেপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যেসব বহুতল ভবনকে মানুষ নিরাপদ আধুনিক জীবনের প্রতীক মনে করত, সেগুলি কয়েক সেকেন্ডের কম্পনে কংক্রিট, লোহা আর ধুলোর স্তূপে পরিণত হয়েছে। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা কয়েকশো ছাড়িয়েছে, কিন্তু আশঙ্কা করা হচ্ছে প্রকৃত সংখ্যা কয়েক হাজারেরও বেশি হতে পারে। নিখোঁজ মানুষের তালিকা প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে— সময়ের সঙ্গে যাদের বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে।
প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হেনেছিল ক্যারিবিয়ান উপকূলবর্তী মোরোন অঞ্চলের পশ্চিমে। এর উৎসস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় বাইশ কিলোমিটার নিচে। কিন্তু প্রকৃত বিভীষিকা তৈরি হয় ঠিক এক মিনিট পরে, যখন দ্বিতীয় ও আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পটি মাত্র দশ কিলোমিটার গভীরতা থেকে বিস্ফোরিত হয়। ভূমিকম্পবিজ্ঞানে একটি কথা সুপরিচিত— যত অগভীর স্তর থেকে ভূকম্পন উৎপন্ন হয়, ধ্বংসের সম্ভাবনা তত বেশি। কারণ সেই শক্তি মাটির উপরে পৌঁছাতে খুব বেশি বাধার সম্মুখীন হয় না।
দুর্ভাগ্য এই যে, দিনটি ছিল ছুটির দিন। অধিকাংশ মানুষ নিজেদের বাড়িতে, বিশেষ করে বহুতল আবাসনে অবস্থান করছিলেন। ফলে হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। কিন্তু এই ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল—এত উন্নত প্রযুক্তি, শত শত উপগ্রহ, সুপারকম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর অন্যতম শক্তিধর দেশগুলির বিজ্ঞানীরা আগাম কোনও সুনির্দিষ্ট সতর্কবার্তা দিতে পারেননি।
আমরা জানি, পৃথিবীর অভ্যন্তরে বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেট অবিরাম গতিশীল। কোটি কোটি বছর আগে ভারতীয় ভূখণ্ড যে বৃহৎ প্লেটের অংশ ছিল, সেটি ধীরে-ধীরে সরে এসে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সেই সংঘর্ষের ফলেই সৃষ্টি হয়েছিল হিমালয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া আজও থেমে নেই। পৃথিবীর অভ্যন্তরে এখনও সেই বিশাল প্লেটগুলির অদৃশ্য ঠেলাঠেলি চলছে। কোথাও চাপ জমছে, কোথাও শিলাস্তর ফেটে যাচ্ছে এবং একসময় সেই জমে থাকা শক্তি মুক্তি পাচ্ছে ভূমিকম্প হিসেবে।
কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এখানেই সমস্যায় পড়ে। কারণ এই চাপ জমার প্রক্রিয়া কোথায়, কত দ্রুত, কোন মুহূর্তে বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাবে— তা নির্ভুলভাবে মাপার মতো প্রযুক্তি এখনও মানুষের হাতে নেই।
আরও উদ্বেগের বিষয়, বহু পরিবেশবিদ মনে করছেন সব ভূমিকম্প প্রাকৃতিক নয়। মানুষের লাগামছাড়া উন্নয়নও পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্ট করছে। অযাচিত খনিজ উত্তোলন, কয়লা ও তেল আহরণ, পাহাড় কেটে নগরায়ণ, বিশাল জলাধার নির্মাণ, বনভূমি ধ্বংস— এসব পৃথিবীর গভীরে সূক্ষ্ম চাপ পরিবর্তনের পটভূমি তৈরি করছে।
ভূমিকম্পের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগে বৃহৎ মাত্রার ভূমিকম্পের মধ্যে সময়ের ব্যবধান তুলনামূলক বেশি ছিল। এখন সেই ব্যবধান ক্রমশ কমছে। শুধু তাই নয়, ভূমিকম্পে মুক্ত হওয়া শক্তির মাত্রাও বাড়ছে।
২০১৫ সালে নেপালে যে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছিল, বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখিয়েছিলেন—সেই বিস্ফোরিত শক্তি ছিল বহু তাপ-পরমাণু অস্ত্রের সম্মিলিত শক্তির সমান। একবার কল্পনা করুন, পৃথিবীর গভীরে কত বিপুল শক্তি প্রতিনিয়ত জমা হচ্ছে!
জাপান বারবার ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী নির্মাণ ব্যবস্থা, দুর্যোগ মোকাবিলার বিশ্বসেরা প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও তারা প্রকৃতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। একইভাবে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, চীন, বাংলাদেশ— সমস্ত দক্ষিণ এশিয়াই আজ ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে হিন্দুকুশ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই ভূকম্পীয় অস্থিরতার জন্য পরিচিত। সেখানে উৎপন্ন ভূকম্পন ভারতীয় উপমহাদেশের জন্যও এক ধরনের অদৃশ্য সতর্কসংকেত।
প্রকৃতির একটি নিজস্ব ভাষা আছে। প্রকৃতির ভাষা শব্দে প্রকাশিত হয় না। কখনও বন্যা হয়ে আসে, কখনও খরা হয়ে, কখনও হিমবাহ গলিয়ে দেয়, কখনও সুনামি হয়ে সভ্যতাকে গ্রাস করে। আর কখনও পৃথিবীর বুক কাঁপিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা প্রকৃতির মালিক নই, আমরা কেবল তার অস্থায়ী অতিথি। মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল সম্ভবত এখানেই— সে নিজেকে প্রকৃতির নিয়ন্তা ভাবতে শুরু করেছে। প্রযুক্তির সাফল্যে আমরা মুগ্ধ, কিন্তু সেই প্রযুক্তি এখনও পৃথিবীর অন্তর্লীন ভাষা পুরোপুরি পড়তে শেখেনি।
প্রকৃতি যেন বারবার বলছে— ‘তোমরা যত উঁচু অট্টালিকা গড়ো, যত উন্নয়নের গান গাও, মনে রেখো তোমাদের সমস্ত সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে এক চলমান, অস্থির, জীবন্ত গ্রহের উপর।’
আর যদি উন্নয়নের অন্ধ প্রতিযোগিতায় আমরা পরিবেশকে ধ্বংস করতেই থাকি, তবে ভবিষ্যতের পৃথিবী আরও অনিশ্চিত হবে। বন্যা, ভূমিধস, সুনামি, খরা, হিমবাহ গলন এবং ক্রমবর্ধমান ভূমিকম্প— এসব আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলি প্রকৃতির প্রতিবাদ। পৃথিবী আজও বেঁচে আছে। কিন্তু তার নীরবতার নিচে জমছে ক্রোধ। আর মানুষ?
সে এখনও আকাশ জয়ের স্বপ্নে বিভোর, অথচ পায়ের নিচের মাটির ভাষা পড়তে শেখেনি।
পৃথিবীর অন্তর্লীন ক্রোধ : বিজ্ঞান, ভূমিকম্প ও সভ্যতার অসহায়তা
earthquake_china