ই-কমার্স ও বিদেশি বিনিয়োগে ভারত

Image: IANS

একটি সাম্প্রতিক নীতিগত সিদ্ধান্ত ভারতের ই-কমার্স খাতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার দেশেই উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানির ক্ষেত্রে ইনভেন্টরি-ভিত্তিক ই-কমার্সে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) অনুমোদন করেছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এখন ই-কমার্স সংস্থাগুলি নিজেরা পণ্য মজুত রেখে বিদেশে সরাসরি বিক্রি করতে পারবে— যদি সেই পণ্য ভারতে তৈরি হয়। এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি নিয়ম বদল নয়; এটি ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলির (এমএসএমই) জন্য একটি বড় সুযোগ।

ভারতের রপ্তানিতে ই-কমার্সের অবদান এখনও খুবই কম। অথচ বিশ্ববাজারে এর সম্ভাবনা বিপুল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতীয় এমএসএমই-গুলি বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য— যেমন হস্তশিল্প, পোশাক, গয়না— ই-কমার্সের মাধ্যমে রপ্তানি করে। কিন্তু একই ক্ষেত্রে চিন প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করছে। এই বিশাল পার্থক্য দেখলেই বোঝা যায়, আমরা এখনও সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারিনি।

এই পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হল জটিল নিয়মকানুন। এখন পর্যন্ত ই-কমার্স রপ্তানির জন্য যে নিয়মগুলি ছিল, সেগুলি মূলত বড় ব্যবসায়িক রপ্তানির কথা মাথায় রেখে তৈরি। কিন্তু একজন ছোট ব্যবসায়ী বা কারিগরের পক্ষে সেই একই নিয়ম মেনে চলা খুবই কঠিন। বিদেশে সরাসরি পণ্য বিক্রি করতে গেলে নানা ধরনের কাগজপত্র, শুল্ক সংক্রান্ত তথ্য, এবং ডিজিটাল রেকর্ড রাখতে হয়।


বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বাজারে এখন পণ্যের পুরো জীবনচক্র— কোথায় তৈরি, কীভাবে তৈরি— এসবের বিস্তারিত তথ্য দিতে হয়। আবার আমেরিকার মতো দেশও কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কথা ভাবছে, যদি তারা মনে করে পণ্য তৈরিতে অনৈতিক শ্রম ব্যবহার হয়েছে।

এই জটিল পরিস্থিতিতে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বড় প্ল্যাটফর্মগুলির কাছে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলার অভিজ্ঞতা। তারা সহজেই প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরি করতে পারে এবং ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে। ফলে ছোট ব্যবসায়ীরা নিজেরা সবকিছু সামলানোর বদলে এই প্ল্যাটফর্মের সাহায্য নিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারে।

এই নতুন নীতির ফলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হবে— ই-কমার্স সংস্থাগুলির ব্যবসার ধরনে। এতদিন তারা মূলত ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সংযোগ তৈরি করে কমিশন নিত। এখন তারা নিজেরাও পণ্য কিনে মজুত রেখে সরাসরি বিক্রি করতে পারবে। এর ফলে তাদের লাভের সম্ভাবনা বাড়বে, এবং একই সঙ্গে রপ্তানি ব্যবস্থাও আরও সুসংগঠিত হবে।

ভারতের এমএসএমই খাতের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে খুব সীমিত সংখ্যক ছোট ব্যবসায়ীই ই-কমার্সের মাধ্যমে বিদেশে পণ্য বিক্রি করতে পারে, এবং তাদের বেশিরভাগ পণ্যের মূল্যও খুব কম। নতুন নীতি কার্যকর হলে আরও বেশি ব্যবসায়ী এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, তেমনি ভারতীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক পরিচিতিও বৃদ্ধি পাবে।

তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু নীতিগত পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সচেতনতা, প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামোর উন্নয়ন। ছোট ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়াতে হবে, তাদের আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বুঝতে হবে। পাশাপাশি সরকারকেও লজিস্টিক্স, প্যাকেজিং এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে উদ্যোগী হতে হবে।

সব মিলিয়ে, ইনভেন্টরি-ভিত্তিক ই-কমার্সে এফডিআই অনুমোদন ভারতের রপ্তানি খাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে এটি দেশের এমএসএমই খাতকে শক্তিশালী করবে এবং বিশ্ববাজারে ভারতের অবস্থান আরও মজবুত করবে। এখন প্রয়োজন এই সুযোগকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার— পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত প্রয়াসের মাধ্যমে।