উৎসবের মরসুমে চিনি-সংকট, সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা

Image: AI নির্মিত

উৎসবের মরসুমে বাজারে চিনির দাম বাড়ছে, সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সাধারণ মানুষের কাছে এটি হয়তো নিত্যপ্রয়োজনীয় একটি পণ্যের দাম বাড়ার ঘটনা। কিন্তু এর পিছনে যে প্রশ্নটি উঠে আসছে, তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা এবং জ্বালানি-নিরাপত্তার নীতির মধ্যে কি ধীরে ধীরে সংঘাত তৈরি হচ্ছে?

এ বছর দেশে চিনি উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই কম হয়েছে। অথচ দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মোট উৎপাদনের কাছাকাছি। পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই কারণে যে, উৎপাদনের ঘাটতি স্পষ্ট হওয়ার আগেই ভারত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিনি রপ্তানি করেছে। এখন সেই ঘাটতি সামাল দিতে প্রায় এক দশক পর ফের শুল্কমুক্ত চিনি আমদানির দরজা খুলতে হয়েছে। একসময় যে দেশ চিনি রপ্তানি করছিল, তাকেই এখন দেশীয় বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখতে বিদেশ থেকে চিনি আনতে হচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু বাজারের ওঠানামা নয়, নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।

অবশ্যই এর জন্য আবহাওয়াকে দায়ী করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আখ এমন একটি ফসল, যার উৎপাদন জলের উপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘ সময়ের শুষ্কতা, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং বিভিন্ন রোগ আখের ফলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ আখ উৎপাদক রাজ্যগুলিতে এর প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি বাজারে মজুতদারি, কৃত্রিমভাবে চাহিদা বাড়ানো বা ভবিষ্যতে দাম বাড়বে এই আশায় অতিরিক্ত কেনাকাটাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে থাকতে পারে।


কিন্তু শুধু আবহাওয়া বা ব্যবসায়ীদের ভূমিকা দিয়ে এই সংকটের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ হয় না। আসল প্রশ্ন উঠছে উৎপাদনের পূর্বাভাস নিয়ে। যদি কোনও মরসুমে উৎপাদন সম্পর্কে হিসাব এতটাই আশাবাদী হয় যে, তার ভিত্তিতে রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়, অথচ একই মরসুমে পরে দেশীয় চাহিদা মেটাতে আমদানি করতে হয়, তাহলে দেশের কৃষি-পরিসংখ্যান ও পূর্বাভাস ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

এই প্রসঙ্গে ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল, অর্থাৎ ই-২০ নীতির কথাও সামনে আসছে। তবে সরলভাবে বলা ঠিক হবে না যে, ই-২০-র কারণেই চিনির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ইথানল ব্যবহারের পিছনে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি-নিরাপত্তার লক্ষ্য রয়েছে। অপরিশোধিত তেলের আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় কৃষিপণ্য থেকে জ্বালানি তৈরির সুযোগ বাড়ানো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

তবু সমস্যার অন্য দিকটিও দেখতে হবে। আখ একই সঙ্গে চিনি এবং ইথানল— দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহারযোগ্য। ভালো ফলনের বছরে এই ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব। কিন্তু যখন ফসল খারাপ হয়, তখন আখের একটি অংশ ইথানল তৈরিতে চলে গেলে চিনির বাজারে ঘাটতি সামাল দেওয়ার জন্য হাতে থাকা অতিরিক্ত মজুত কমে যায়। ফলে ই-২০ হয়তো এই সংকট তৈরি করেনি, কিন্তু উৎপাদন সম্পর্কে ভুল হিসাবের অভিঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

তাই খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি-নীতি এবং কৃষিপণ্যের বাণিজ্যকে আলাদা আলাদা খাতে দেখলে চলবে না। একদিকে আখ থেকে ইথানল উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া, অন্যদিকে আশাবাদী উৎপাদন অনুমানের ভিত্তিতে চিনি রপ্তানি করা, আর পরে ঘাটতি দেখা দিলে আমদানির ব্যবস্থা করা— এই নীতিগুলির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট।

এর অর্থ অবশ্য ই-২০ নীতি বাতিল করতে হবে, এমন নয়। বরং প্রয়োজন নমনীয় নীতির। উৎপাদনের পূর্বাভাস হঠাৎ কমে গেলে ইথানলের জন্য আখ ব্যবহারের বরাদ্দ সাময়িকভাবে কমানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। দেশের চিনির মজুত একটি নির্দিষ্ট নিরাপত্তা-সীমার নিচে নেমে গেলে রপ্তানির উপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে চিনি উৎপাদনের পূর্বাভাসকে আরও নির্ভুল ও স্বাধীনভাবে যাচাই করার ব্যবস্থা দরকার।

চিনির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের জন্য কৌশলগত মজুতও গড়ে তোলা উচিত। খাদ্যনিরাপত্তার সুরক্ষা-কবচ হিসেবে এই মজুতের গুরুত্ব অন্য খাদ্যশস্যের মজুতের তুলনায় কোনও অংশে কম নয়।

জ্বালানি-নিরাপত্তা ভারতের জন্য জরুরি। কিন্তু সেই নিরাপত্তার মূল্য যদি খাদ্যনিরাপত্তাকে দুর্বল করে দিতে শুরু করে, তাহলে নীতির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে ভাবতেই হবে। ই-২০ সফল হোক, কৃষকের আখেরও সঠিক মূল্য মিলুক, দেশের জ্বালানি আমদানির চাপও কমুক— কিন্তু তার জন্য যেন উৎসবের বাজারে সাধারণ মানুষকে বাড়তি দামে চিনি কিনে ভুল নীতির খেসারত দিতে না হয়। সংকটটি তাই শুধু চিনির নয়; এটি নীতিনির্ধারণে দূরদৃষ্টি, পূর্বাভাসের নির্ভুলতা এবং বিভিন্ন নীতির মধ্যে সমন্বয়ের পরীক্ষাও।