পশ্চিমবঙ্গের শিল্প মানচিত্রে দুর্গাপুর-আসানসোল অঞ্চল বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। একসময় এই অঞ্চলকে রাজ্যের শিল্পের প্রাণকেন্দ্র বলা হতো। কয়লা, ইস্পাত, ভারী যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ ও নানা ধরনের শিল্পকে ঘিরে এখানে গড়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের দুরবস্থা, নতুন বিনিয়োগের অভাব এবং জমি সংক্রান্ত জটিলতায় এই অঞ্চলের শিল্পোন্নয়নের গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এবার সেই পরিস্থিতি বদলের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি এবং জমির সহজলভ্যতা দুর্গাপুর-আসানসোলকে আবার শিল্প বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য করে তুলতে পারে।
সবচেয়ে বড় আশার খবর, আসানসোল-দুর্গাপুর উন্নয়ন সংস্থা বা এডিডিএ-র হাতে রয়েছে প্রায় ৮,৮০০ একর ব্যবহারযোগ্য জমি। এত বিপুল পরিমাণ জমি হাতে থাকা যে কোনও শিল্পাঞ্চলের পক্ষে বড় সম্পদ। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে জমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জমির অভাবে বহু বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় না। সেই জায়গায় দুর্গাপুর-আসানসোল অঞ্চলের এই জমির ভাণ্ডার নতুন শিল্প স্থাপনের পথ অনেকটাই সহজ করতে পারে।
নতুন শিল্পনীতির অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো জমি সংগ্রহের ক্ষেত্রে তিনটি পৃথক পথ গ্রহণ। জমির মালিকদের কাছ থেকে সরাসরি জমি কেনা, সরকারি শিল্প পার্কগুলির জমি ব্যবহার এবং শিল্পাঞ্চলে বরাদ্দ হলেও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা জমি পুনরুদ্ধার— এই তিন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিল্পের জন্য জমির জোগান বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে জমির মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করে শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতাও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুর্গাপুর-আসানসোলের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে প্রস্তাবিত শিল্প ও অর্থনৈতিক করিডর। প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক এবং কোরিয়ার এক্সিম ব্যাঙ্কের অর্থায়ন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। রঘুনাথপুর, আসানসোল, রানিগঞ্জ, দুর্গাপুর, বর্ধমান, ডানকুনি এবং তাজপুরকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা এই অঞ্চলের শিল্প ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে কাঁচামাল পরিবহন, পণ্য সরবরাহ এবং বাজার সম্প্রসারণ অনেক সহজ হবে।
এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা শুধু প্রচলিত ভারী শিল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পেও দুর্গাপুর নতুন পরিচয় তৈরি করতে পারে। দুর্গাপুরের জাতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনআইটি-র ছাত্রদের তৈরি দেশীয় মাইক্রোচিপ সেই সম্ভাবনারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
জাপানের মিতসুবিশি সংস্থার প্রতিনিধিদলের দুর্গাপুর অথবা পানাগড়ে সেমিকন্ডাক্টর কারখানা স্থাপনের আগ্রহ প্রকাশও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও এখনও কোনও সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়নি, তবু এই আগ্রহকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিনিয়োগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে উঠলে শুধু প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানই নয়, তার সঙ্গে যুক্ত বহু ছোট ও মাঝারি শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পরিকল্পনার দ্রুত ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। জমি কেনা, জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ, পরিবেশ রক্ষা, বিদ্যুৎ ও জল সরবরাহ এবং দক্ষ শ্রমিক তৈরির বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। শিল্পের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নও নিশ্চিত করা জরুরি।
দুর্গাপুর-আসানসোলের রয়েছে শিল্পের ঐতিহ্য, দক্ষ শ্রমশক্তি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার শক্ত ভিত। এর সঙ্গে যদি নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক পরিকাঠামো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ যুক্ত হয়, তবে এই অঞ্চল আবার রাজ্যের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। শিল্পের বিকাশ মানে শুধু কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; এর অর্থ কর্মসংস্থান, ব্যবসার প্রসার, স্থানীয় বাজারের উন্নতি এবং মানুষের আর্থিক স্বনির্ভরতা।
অতএব, নতুন শিল্পনীতিকে ঘিরে যে আশার আলো দেখা যাচ্ছে, তাকে বাস্তব সাফল্যে পরিণত করাই এখন প্রধান দায়িত্ব। দুর্গাপুর-আসানসোলের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের ইতিহাসে এই অঞ্চল আবার গৌরবের আসন ফিরে পেতে পারে।