শারদোৎসব এখন সর্বজনীন শারদ-বাণিজ্যও

ফাইল ছবি।

কলকাতার শারদ উৎসব বিশ্ববন্দিত। উৎসবের কয়েকদিন কলকাতা যেন জাদুবাস্তবের মায়াময় পরিসর হয়ে ওঠে। দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধু দেবীর আরাধনা নয়, এটিকে বাংলার সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উৎসব বলা যায়। বর্তমানে দুর্গাপুজো বহু বিচিত্র যুগোপযোগী উপাদান সহযোগে এক বর্ণাঢ্য উৎসবে পরিণত হয়েছে। জীবনের সব রংকে ছুঁয়েছে দুর্গাপুজো। মানুষের চাওয়া পাওয়া দুর্গাপুজোর সঙ্গে জুড়ে গেছে। ব্যবসা বাণিজ্যেও জোয়ার আসে এইসময়। সব কিছু মিলে দুর্গাপুজো এখন এক মহা মিলনমেলা, আনন্দমেলা ও বাণিজ্যমেলায় পরিণত হয়েছে। দুর্গাপূজা তাই শুধু আনন্দের উৎসব নয়, এ যেন অর্থনীতিরও এক বড় চালিকাশক্তি।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দুর্গাপুজো এখন এক বৃহত্তর অর্থনৈতিক লেনদেনের খোলা মঞ্চ, যেখানে পুজোর প্রায় মাস খানেক আগে থেকে বিভিন্ন পেশার মানুষ বিভিন্নভাবে উপকৃত হন। অর্থনীতিবিদদের মতে, দুর্গাপুজো পশ্চিমবঙ্গের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রায় ২.৬ শতাংশ জুড়ে রেখেছে। কোনও রাজ্য ও দেশের অগ্রগতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল টাকার লেনদেন। স্বাভাবিকভাবেই উৎসবের মাসখানেক আগে থেকেই এটা শুরু হয় এবং উৎসবের দিন যত এগোতে থাকে তত এর চলাচল বাড়তে থাকে। রিও কার্নিভাল, জাপানের হানামি, মিউনিখের অক্টোবর ফেস্ট, পাম্পলোনার সান ফের্মিন এবং নিউ অর্লিন্সের মার্ডি গ্রাস উৎসবের মত দুর্গাপুজোও সংশ্লিষ্ট অর্থনীতির জিডিপিতে আনুমানিক বিশেষ অবদান রাখে। এটি পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে সুদৃঢ় করার এক অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্ম, বর্ণ এবং সংস্কৃতির গণ্ডি পেরিয়ে এই উৎসব আজ এক বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে, যা সমাজের একেবারে নিচুতলা থেকে শুরু করে ওপরতলা— সব স্তরের মানুষের হাতে তুলে দেয় বিপুল আয়ের সুযোগ।

দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বাংলায় যে বিপুল অর্থনীতির সৃষ্টি হয়, তার আকার শুনলে বিশ্বের তাবড় অর্থনীতিবিদরাও অবাক হতে বাধ্য হবেন। বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সংস্থা ব্রিটিশ কাউন্সিল কর্তৃক প্রকাশিত একটি বিশদ সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজোকে ঘিরে তৈরি হওয়া সৃজনশীল অর্থনীতির মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। এই অঙ্কটি রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ কেবল বড় বড় পুজো কমিটি বা কর্পোরেট ব্যবসায়ীরাই পান না, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে সমাজের একেবারে প্রান্তিক স্তরের মানুষদের কাছেও। মুটে-মজুর থেকে শুরু করে শিল্পী, পরিবহন কর্মী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী— সবার কাছেই দুর্গাপুজো মানেই সারা বছরের উপার্জনের এক বিশাল বড় সুযোগ। অতিমারীর সময়ে এই অর্থনীতি কিছুটা ধাক্কা খেলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আবার স্বমহিমায় ফিরে এসেছে এবং এর পরিধি উত্তরোত্তর বিপুল হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।


এবার দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে আমরা এক একটি দিককে পর্যবেক্ষণ করব। প্রথমেই আসি প্রতিমা শিল্পের কথায়। দুর্গাপুজোর অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো প্রতিমা তৈরির শিল্প। কলকাতার বিখ্যাত কুমোরটুলি থেকে শুরু করে রাজ্যের আনাচে-কানাচে, প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে থাকা অগণিত মৃৎশিল্পী সারা বছর ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন এই সময়টির জন্য। গঙ্গার মাটি, বাঁশ, খড়, আর রঙের প্রলেপে তাঁরা তিল তিল করে গড়ে তোলেন দশভুজাকে। এই প্রতিমা তৈরির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন হাজার হাজার দক্ষ ও অদক্ষ কারিগর। এই অর্থনীতির গতিবেগ মনে করিয়ে দেয়— মায়ের আগমন কেবল শান্তি নয়, সমৃদ্ধিরও বার্তা বহন করে। এর ঠিক পাশাপাশি রয়েছে আলোকসজ্জার চোখ ধাঁধানো কাজ। হুগলির চন্দননগরের বিখ্যাত আলো থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ের এলইডি বাল্ব, সবটাই এই উৎসব অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডেকোরেটর, ইলেকট্রিশিয়ান, কাঠমিস্ত্রি এবং সাউন্ড সিস্টেমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পুজোর এই কয়েক মাসে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন, তা দিয়ে তাঁদের বছরের একটা বড় সময় অনায়াসে এবং নিশ্চিন্তে কেটে যায়। সৃজনশীলতা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে এই ক্ষেত্রটি আজ এক বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমান সময়ে দুর্গাপুজো মানেই থিমের অভিনব চমক। আর এই থিমকে দর্শকদের সামনে বাস্তব রূপ দিতে প্রয়োজন হয় এক বিশাল কর্মযজ্ঞের।

পুজোর অর্থনীতি যে কতটা গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত, তা বোঝা যায় গ্রামের বাদ্যযন্ত্রীদের দিকে তাকালে। পুজোর সময় ঢাকের বাদ্যি ছাড়া বাঙালির উৎসব অসম্পূর্ণ। গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার ঢাকি বা ঐতিহ্যবাহী ঢোলবাদক এই সময় শহরে আসেন দু-পয়সা রোজগারের আশায়। তাঁদের বাজানো তালে তালেই মুখরিত হয়ে ওঠে শহরের মণ্ডপগুলো। এর পাশাপাশি রয়েছেন রাজ্যের পুরোহিত সমাজ যারা সারা বছর বিভিন্ন ছোটখাটো পুজো করলেও, দুর্গাপুজোর সময় তাদের ব্যস্ততা এবং আয় বহুলাংশে বেড়ে যায়। সারা বছর অল্প অল্প করে সঞ্চয় করে উৎসবের কয়েকদিন মানুষ ছোট ছোট ব্যবসা করেন। বহু জায়গায় কাজের সুযোগ তৈরি হয়। অসংগঠিত ক্ষেত্রে বহু শ্রমিক কিছুদিনের জন্য হলেও রোজগারের দিশা খুঁজে পান। এছাড়াও ফুল বিক্রেতা, দশকর্মা ভাণ্ডারের মালিক, ফল বিক্রেতা এবং পুজোর উপচার যাঁরা জোগান দেন, তাঁদের ব্যবসাও এই কয়েকদিন অভাবনীয় মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। গ্রামীণ হস্তশিল্প এবং ক্ষুদ্র কুটির শিল্পও এই সময় নিজেদের পসরা সাজিয়ে বসে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলে।

বাঙালি ভ্রমণপিপাসু। পুজোর মরসুম ভ্রমণ ও পরিবহন শিল্পের পৌষমাস। তাই পুজোর দিনগুলোতে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ব্যবসা দারুণ জমজমাট। এইভাবে দুর্গাপুজো বাজারের মন্থর অর্থনীতিকে সবল করে, টাকার হাত বদল বৃদ্ধি করে এবং বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে অর্থনীতির পথ সুগম করে।

দুর্গাপুজোয় ঠিক কত টাকার লেনদেন হয়? একবারে সঠিক তথ্য না পেলেও আমরা আনুমানিক একটা ধারণা পেতে পারি। ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল দুর্গাপুজোর অর্থনীতি নিয়ে। সেবছর বাংলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটেছিল। অথচ সেবারও পুজোকে কেন্দ্র করে জামাকাপড়, জুতো, উপহার সামগ্রী, পত্রিকার পুজোসংখ্যা বিক্রির সূচক দেখলে বোঝা যায় প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষ কীভাবে উৎসব উদযাপন করেছিল।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় দিক হল, আয়ের বণ্টন। আধুনিক খুচরো বাজারে যেখানে পুঁজির কেন্দ্রীকরণ বাড়ছে, সেখানে দুর্গাপুজো বিপরীত স্রোতে কাজ করে। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না, বর্তমানে শারদোৎসব বাংলার অর্থনীতির মানদণ্ডের অন্যতম সূচক। শারদোৎসব এখন সর্বজনীন শারদ-বাণিজ্য।

আধুনিক পুজোর অর্থনীতির আরেকটি অত্যন্ত বড় এবং প্রভাবশালী দিক হলো বিজ্ঞাপন। মণ্ডপের আশেপাশে বড় বড় হোর্ডিং, ব্যানার, তোরণ এবং ডিজিটাল মিডিয়াতে বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি দেখা যায়। বিভিন্ন নামিদামি কর্পোরেট সংস্থা তাদের পণ্যের প্রচারের জন্য পুজোর এই বিশাল প্ল্যাটফর্মটিকে নিখুঁতভাবে ব্যবহার করে। বড় বড় পুজো কমিটিগুলোকে তারা আর্থিকভাবে স্পনসর করে, যার ফলে কমিটিগুলো কোটি কোটি টাকার বিশাল বাজেট তৈরি করতে সক্ষম হয়।

শারদোৎসবের লাগামহীন খরচের যথার্থতার প্রশ্ন নিয়ে প্রচুর বিতর্ক ও সমালোচনা হয়েছে। দেশের অর্থনীতি নিম্নগতি কিন্তু শারদবাণিজ্য ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্ববাজারে টাকার দাম কমা, পেট্রল ডিজেলের দাম লাগাম ছাড়া, মুদ্রস্ফীতি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও বড়ো বড়ো শিল্প বাণিজ্য সংস্থা বাঙালির শারদোৎসবকে পাখির চোখ করে। পুজো উপলক্ষে যথেচ্ছ খরচ যদি নিয়ন্ত্রিত করা হয়, তাহলে বাংলার সর্বস্তরের ব্যবসা বাণিজ্যের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

সব দিক বিবেচনা করে পরিশেষে এটাই বলা যায় যে, বাংলার দুর্গাপুজো আজ আর নিছকই একটি সাধারণ উৎসব নেই, এটি একটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং জীবন্ত অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম।