মাদক অজুহাত: তেলের ভাণ্ডারই লক্ষ্য

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

নথি নিজেই যখন অভিযোগ খারিজ করে দেয়, তখন শক্তির দাপটে চালানো ‘ন্যায়বিচার’ আসলে কী— এই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে জরুরি। ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে বন্দি করা হয়েছে যে অজুহাতে, সেই অজুহাতকে খোদ মার্কিন সরকারি রিপোর্টই ভ্রান্ত বলে প্রমাণ করছে। তা হলে এই অপহরণের নৈতিক ও আইনি ভিত্তি কোথায়?

মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ভেনেজ়ুয়েলা আমেরিকায় মাদক পাচারের অন্যতম উৎস। কিন্তু ইউএস ন্যাশনাল সার্ভে অন ড্রাগ ইউজ অ্যান্ড হেল্‌থ-এর ২০২৪ সালের রিপোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানাচ্ছে, আমেরিকায় ঢোকা অধিকাংশ অবৈধ মাদক আসে মেক্সিকো ও কলম্বিয়া থেকে। পরিসংখ্যান বলছে, কোকেন উৎপাদনের বৈশ্বিক কেন্দ্র কলম্বিয়া ২০২৩ সালে বিশ্বে উৎপাদিত প্রায় ৩৭০৮ মেট্রিক টন কোকেনের মধ্যে প্রায় ২৬০০ মেট্রিক টনই এসেছে সে দেশ থেকে। আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তই মাদক পাচারের প্রধান প্রবেশদ্বার। সুড়ঙ্গ, জলপথ, এমনকি দুর্নীতিগ্রস্ত এজেন্টদের ব্যবহার করেও এই পাচার চলে।

এই তথ্যগুলির কোথাও ভেনেজ়ুয়েলাকে মাদক পাচারের মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বরং রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভেনেজ়ুয়েলা থেকে সীমিত পরিমাণ কোকেন ইউরোপের দিকে যায় জলপথে। কিছু ক্ষেত্রে কলম্বিয়া থেকে আসা মাদক ভেনেজ়ুয়েলা হয়ে অন্যত্র যেতে পারে— এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপতিকে “মাদকসন্ত্রাসের মদতদাতা” বলে তুলে ধরা এবং তার ভিত্তিতে সামরিক অভিযান চালানো আন্তর্জাতিক আইনের চোখে অপরাধ ছাড়া আর কী?


এই ঘটনাকে ‘গ্রেপ্তার’ বলা আসলে ভাষার অপমান। কোনও আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, কোনও বহুপাক্ষিক আইনি প্রক্রিয়া, এমনকি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সম্মতিও নেই। মধ্যরাতে কারাকাসের ‘সেফ হাউস’ থেকে বিদেশি সেনার হাতে রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নিয়ে যাওয়া সরাসরি অপহরণ। তা সস্ত্রীক হলে অপরাধের মাত্রা আরও গভীর হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ অনুযায়ী, এটি স্পষ্টতই অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন।

এই প্রথম নয়। লাতিন আমেরিকার ইতিহাস জুড়েই রয়েছে ‘মাদক যুদ্ধ’, ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ কিংবা ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র নামে মার্কিন হস্তক্ষেপের দীর্ঘ তালিকা। পানামায় নোরিয়েগা থেকে শুরু করে ইরাকের সাদ্দাম— প্রতিবারই আগে অভিযোগ, পরে শক্তি প্রয়োগ, শেষে নথি দিয়ে ব্যাখ্যা। কিন্তু নথি যখন আগেই বলে দেয় অভিযোগ অসত্য, তখন সেই শক্তি প্রয়োগকে কী বলা হবে?

আরও একটি প্রশ্ন এড়ানো যায় না। বিশ্বে অবৈধ মাদক সেবনে শীর্ষে রয়েছে আমেরিকাই। ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ রিপোর্ট’ অনুযায়ী, মারিজুয়ানা বাদেও প্রায় ২ কোটি ৭৭ লক্ষ মার্কিন নাগরিক বিভিন্ন অবৈধ মাদকে আসক্ত। এমডিএমএ, এলএসডি, কোকেন— চাহিদার এই বিপুল বাজারই পাচারের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই অভ্যন্তরীণ সামাজিক ব্যর্থতার দায় চাপানো হচ্ছে বাইরের দেশগুলির উপর। দোষের রাজনীতি এখানেই।
ডোনাল্ড ট্রাম্প কলম্বিয়া, মেক্সিকো, কিউবাকে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ‘কোকেন কারখানা’ থাকার অভিযোগ তুলছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টেই যখন স্পষ্ট, কোকা চাষ ও কোকেন উৎপাদন বহুস্তরীয় অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত, তখন একটি নির্বাচিত সরকারকে ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত করা কূটনীতির ভাষা নয়— এটি হুমকির ভাষা।

আজ মাদুরো। কাল কে? যে কোনও দেশ, যে কোনও সরকার, যে কোনও রাষ্ট্রপ্রধান যদি শক্তিধর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রয়োজন হয়। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, রাষ্ট্রপুঞ্জ সবই তখন গৌণ। এই দৃষ্টান্ত শুধু ভেনেজ়ুয়েলার জন্য বিপজ্জনক নয়, এটি গোটা বিশ্বের জন্য এক ভয়ংকর নজির।

মাদক সমস্যার সমাধান সামরিক অভিযানে হয় না। হয় সামাজিক সংস্কারে, সীমান্তে স্বচ্ছ নজরদারিতে, দুর্নীতি দমনে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায়। আর তার প্রথম শর্ত— সত্যকে স্বীকার করা। যখন নিজের রিপোর্টই বলে দেয় ভেনেজ়ুয়েলা দায়ী নয়, তখন সেই দেশকে অপহরণ করে শাস্তি দেওয়া ন্যায়বিচার নয়, বরং ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শন।