সাংবাদিক না প্রভাবক কোন সত্ত্বাটা দরকার?

File Photo

সামাজিক মাধ্যমের যুগে সংবাদ পরিবেশনের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের প্রধান দায়িত্ব ছিল সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সংবাদ সংস্থার। এখন স্মার্টফোন হাতে যে কেউ কোনও ঘটনার ছবি তুলে বা ভিডিও করে মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতে পারেন। এর ফলে সংবাদ পৌঁছনোর গতি বেড়েছে, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও বেড়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে দেখা দিয়েছে সাংবাদিকতার পরিচয়, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং স্বাধীনতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন। সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের ভিডিও ঘিরে সরকারের চিন্তাভাবনা সেই বিতর্ককেই সামনে এনেছে।

একটি প্রথম শ্রেণির সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় বিপুল সংখ্যায় রিল ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ডিজিটাল সাংবাদিক এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবকদের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের কথা ভাবছে সরকার। প্রস্তাবিত মাপকাঠির মধ্যে রয়েছে সাংবাদিকতা কারও আয়ের প্রধান উৎস কি না, তাঁর ইউটিউব চ্যানেল বা সংবাদ পোর্টাল রয়েছে কি না এবং তাঁর অনুসারীর সংখ্যা কত। বিষয়টি এখনও প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

প্রথম দৃষ্টিতে সাংবাদিকতার পরিচয় নির্ধারণের উদ্যোগ অযৌক্তিক নয়। সামাজিক মাধ্যমে অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্য, পুরনো ভিডিও কিংবা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য নতুন ঘটনার নামে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এমন কাজও করেন, যা পেশাদার সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে মেলে না। ফলে সংবাদ সংগ্রহের বিশেষ সুযোগ কারা পাবেন, তা নির্ধারণের জন্য কিছু যুক্তিসংগত নিয়ম থাকা প্রয়োজন। এতে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা এবং অপ-তথ্যের বিস্তার কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।


কিন্তু প্রশ্ন হল, সাংবাদিকতার স্বীকৃতি দেওয়ার মাপকাঠি কী হবে? কারও আয়ের প্রধান উৎস সাংবাদিকতা হলেই তিনি নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার কোনও ব্যক্তি অন্য পেশায় যুক্ত থেকেও গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের খবর সংগ্রহ করতে পারেন। একইভাবে, অনুসারীর সংখ্যা সাংবাদিকতার দক্ষতা বা সততার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নয়। একজন নতুন ডিজিটাল সাংবাদিকের অনুসারী কম হতে পারে, অথচ তাঁর প্রতিবেদন জনস্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই শুধু আয়, পরিচয়পত্র কিংবা জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে সাংবাদিকতার যোগ্যতা নির্ধারণ করলে অনেক প্রকৃত সংবাদকর্মী বাদ পড়ার আশঙ্কা থাকবে।

আন্দোলনের সময় নাগরিকদের তোলা ভিডিওর গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না। কোনও ঘটনাস্থলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকলেও সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনে পুলিশের আচরণ, প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য কিংবা প্রশাসনের পদক্ষেপের ছবি ধরা পড়তে পারে। এই ভিডিও কখনও অন্যায় প্রকাশে সাহায্য করে, কখনও আবার অসম্পূর্ণ দৃশ্যের কারণে ভুল ধারণা তৈরি করে। তাই ভিডিওর সত্যতা যাচাই, ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। তবে কোনও ভিডিও সরকারের সমালোচনা করছে বলেই তাকে অবিশ্বাস্য বা ক্ষতিকর বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

এখানেই সরকারের উদ্যোগ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠছে। সাংবাদিকদের বিশেষ প্রবেশাধিকার বা স্বীকৃতির জন্য নিয়ম থাকতে পারে। কিন্তু সেই নিয়ম যেন সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা সীমিত করার হাতিয়ার না হয়ে ওঠে। কে সাংবাদিক, তা নির্ধারণের ক্ষমতা যদি প্রশাসনের হাতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে সরকারের সমালোচনাকারী সাংবাদিক বা ছোট সংবাদমাধ্যমের উপর চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু সরকারের বক্তব্য প্রচার করা নয়, সরকারের কাজকর্মের উপর নজর রাখা এবং জনস্বার্থের প্রশ্ন তোলাও।

অতএব, সমাধান হওয়া উচিত স্পষ্ট, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নীতির মাধ্যমে। সাংবাদিকতার স্বীকৃতির মাপকাঠি প্রকাশ্যে জানাতে হবে, সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রাখতে হবে এবং কোনও রাজনৈতিক মতামত বা সরকারের সমালোচনাকে অযোগ্যতার কারণ করা চলবে না। একই সঙ্গে ডিজিটাল সংবাদদাতা ও নাগরিক সাংবাদিকদের তথ্য যাচাই, গোপনীয়তা রক্ষা এবং দায়িত্বশীল প্রতিবেদন তৈরির বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন।