ভাতা কি মানুষকে ক্ষমতায়িত করে: ভাবাটা জরুরী

প্রতীকী চিত্র

রতন ভট্টাচার্য

মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক ভারসাম্য, শিক্ষার সুযোগ, কর্মসংস্থানের ভিত্তি—এসব ক্ষেত্রেই ভাতা বা এলাউন্স একটি বৃহৎ ভূমিকা পালন করে এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই ব্যবস্থাকে ঘিরে নানা প্রশ্নও জেগে ওঠে—এগুলো কি মানুষকে ক্ষমতায়িত করে, না কি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দেয়? ইতিহাস বলছে, ভাতার ধারণা নতুন নয়; এটি সভ্যতার শুরুর যুগ থেকেই মানবসমাজের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় সমাজে রাজারাজড়াদের দান, ভিক্ষুদের জন্য খাদ্যাভাতা, কবি ও শিল্পীদের জন্য সম্মান—এসব ছিল ভাতা ব্যবস্থার প্রাথমিক রূপ। তখন রাষ্ট্র বা শাসকগোষ্ঠী সরাসরি সেবা প্রদান করত, আর বিনিময়ে শৃঙ্খলা, আনুগত্য বা সংস্কৃতির বিকাশ চলত। ভাতা শুধুমাত্র অর্থ নয়, খাদ্য, বস্ত্র, জমি, বা সামগ্রী হিসেবেও দেওয়া হতো।ভাতা বা এলাউন্সের ইতিহাস এবং এগুলো কি সত্যিই কল্যাণ বয়ে আনতে পারে—এই প্রশ্ন আজকের সময়ের সমাজ, রাষ্ট্র এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্যযুগে রাজশক্তির বিকাশের সঙ্গে ভাতার কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়। সৈনিকদের রেশন, যুদ্ধজীবীদের জীবিকার ব্যবস্থা, কৃষকদের ফসলের ভাতার মতো কার্যক্রম তখনকার feudal system–এ দেখা যেত। মুসলিম শাসনামলেও উলামা, সুফি, বিদ্বান ও সৈন্যদের নানা ধরনের মোয়াজনা বা স্টাইপেন্ড দেওয়া হত। এসবই মূলত ভাতার উন্নততর সংস্করণ। এই সময় ভাতা ব্যবস্থার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—এগুলো ব্যক্তির মর্যাদা বা দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল। সমাজে কেউ জ্ঞানচর্চা বা ধর্মীয় কাজ করলে তাকে স্টাইপেন্ড দেওয়া হত, কেউ রাজার সৈন্য হলে রেশন বা বেতনস্বরূপ ভাতা পেত। রাষ্ট্র তখনই উপলব্ধি করেছিল যে, মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো প্রতিষ্ঠান বা শাসনব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না।


ব্রিটিশ আমলে এসে ভাতার আধুনিক রূপ তৈরি হয়। ভারতীয় প্রশাসন কাঠামোতে তখন প্রথম যুক্ত হয় ডিয়ারনেস অ্যালাউন্স (DA), ট্রাভেল অ্যালাউন্স, মেডিক্যাল অ্যালাউন্স, হাউস রেন্ট অ্যালাউন্স (HRA), এবং অন্যান্য নাগরিকভাতা। এগুলোর মাধ্যমে আধুনিক চাকরি ব্যবস্থা একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক কাঠামো পায়। এই ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য ছিল সরকারী কর্মচারীদের জীবনের মান স্থিতিশীল রাখা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বজায় রাখা।স্বাধীনতার পরে ভারতবর্ষে ভাতা ব্যবস্থার বিস্তৃতি হয় বহু গুণে। নতুন রাষ্ট্রের সামনে তখন দুই বড় সমস্যা—দারিদ্র্য ও বৈষম্য। এই অবস্থায় সরকার ভাতাকে সামাজিক ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হিসেবে দেখল। বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কৃষিভাতা, শ্রমিক কল্যাণ ভাতা, একক মায়ের ভাতা–এসব কর্মসূচি ধীরে ধীরে কোটি মানুষের জীবনে নিরাপত্তা এনে দেয়। কর্মসংস্থান কম থাকায় এবং শিক্ষার প্রসার অসম হওয়ায় তখন ভাতা একটি সমাজিক স্থিতি রক্ষার উপায় হয়ে ওঠে। পরে বিভিন্ন রাজ্য সরকার বিশেষ বিশেষ ভাতা প্রবর্তন করে—কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, ওল্ড এজ পেনশন, কৃষি সম্মান নিধি, বেকারভাতা ইত্যাদি। এসবের লক্ষ্য ছিল দুর্বল জনগোষ্ঠীকে শক্তিশালী করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া।বিশ্ব ইতিহাসেও ভাতা ব্যবস্থার গুরুত্ব অনেক।

ইউরোপে ২০শ শতকের শুরুতে welfare state গঠনের কেন্দ্রে ছিল ভাতা। ইংল্যান্ডে Family Allowance Act, জার্মানিতে সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশে Universal Basic Welfare—এসবই আধুনিক রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক মনোভাবের ভিত্তি। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩৫ সালের Social Security Act প্রবীণ, প্রতিবন্ধী, বিধবা এবং শিশুদের জন্য ভাতা ব্যবস্থাকে আইনি রূপ দেয়। ফলে স্পষ্ট যে ভাতা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সাহায্য নয়, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক দায়বদ্ধতার এক গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। কিন্তু ভাতা কি সত্যিই মানুষের বাস্তব উন্নতি ঘটায়? নাকি এটি কেবল সাময়িক সান্ত্বনা প্রদান করে? এই প্রশ্নের উত্তর বহুস্তরীয়। প্রথমত, গবেষণা দেখায় ভাতা দারিদ্র্য কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। বিভিন্ন দেশে cash transfer program–এর মাধ্যমে দেখা গেছে—ভাতা পাওয়া পরিবারে শিশুরা বেশি স্কুলে যায়, স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে, পুষ্টির স্তর বাড়ে, এবং কর্মহীনতা কমে।

সাধারণ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর জন্য সামান্য ভাতাও বিপুল সহায়তা। উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলের Bolsa Família বা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সামাজিক ভাতা প্রকল্পগুলো উল্লেখ করা যায়, যেগুলো বহুলাংশে দারিদ্র্য হ্রাসে সাফল্য পেয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ভাতা শিক্ষায় সমতা আনে। দরিদ্র পরিবারে বৃত্তি বা আলাউন্স না থাকলে অনেক শিশু মাধ্যমিক স্তরের আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কন্যাশ্রীর মতো উদ্যোগ দেখিয়েছে, ভাতা মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখতে বিশেষভাবে কার্যকর। একই সঙ্গে বয়স্কদের পেনশন ও প্রতিবন্ধীভাতা তাদের জীবনে মর্যাদা এনে দেয়। সমাজে যে মানুষগুলো আগে অদৃশ্য হয়ে যেত, ভাতা তাদের দৃশ্যমান করে তোলে, আত্মসম্মান ফিরিয়ে দেয়।

তৃতীয়ত, ভাতা সামাজিক অসাম্য কমায়। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে social redistribution বলা হয়। ধনী-গরিব ব্যবধান চরম হলে রাষ্ট্র ভাতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। অনেক রাষ্ট্রে করের টাকা দিয়ে ভাতা দেওয়া হয়, যাতে সমাজের দুর্বল শ্রেণি ন্যূনতম নিরাপত্তা পায়। এটি শুধু মানবিক নয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য। ক্ষুধার্ত, বেকার ও অসহায় মানুষ রাষ্ট্রে অশান্তি তৈরি করে; ভাতা সেই উত্তেজনা কমায়।
চতুর্থত, ভাতা স্থানীয় অর্থনীতিকে সক্রিয় করে।

অর্থনীতি বিজ্ঞান বলে—গরিব মানুষের হাতে টাকা দিলে তারা তা সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় করে। ফলে বাজার সচল হয়, ব্যবসা বাড়ে, ছোটখাটো দোকান ও পরিষেবা খাত নতুন গতি পায়। গ্রামের অর্থনীতি বিশেষভাবে লাভবান হয়। ভাতা আসলে অর্থের প্রবাহ বাড়ায়, যা মন্দার সময়েও অর্থনীতিকে ধরে রাখে।তবে ভাতার সীমাবদ্ধতাও কম নয়। প্রথমত, অনেক সময় ভাতার পরিমাণ এত কম যে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। কয়েকশো টাকার ভাতা দিয়ে একটি পরিবারের স্বাস্থ্য বা পুষ্টির চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি বা দেরি ভাতা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। অনেক প্রকল্পে মাঝের স্তরে অর্থ লোপাট হয়, অথবা সুবিধাভোগীর নাম তালিকায় ওঠে না। তৃতীয়ত, ভাতা কখনো কখনো কর্মসংস্থানের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে—বিশেষ করে যদি ভাতার পরিমাণ শ্রমের মজুরির সমান হয়।

চতুর্থত, ভাতা সামাজিক সমস্যাকে শিকড়ে গিয়ে সমাধান করে না। দারিদ্র্যের মূল কারণ শিক্ষা-স্বল্পতা, কর্মসংস্থান সংকট, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা—এসব অনুন্নতই থেকে যায়, যদি শুধুমাত্র ভাতা দিয়ে সমস্যা মোকাবিলা করা হয়। ভাতা মানুষকে টিকিয়ে রাখে, কিন্তু এগিয়ে নিয়ে যায় না—এই সমালোচনাটিও তাই অমূলক নয়। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, শিল্প, কৃষি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর জোর দেয়। রাজনৈতিক অপব্যবহারও ভাতা ব্যবস্থার একটি গুরুতর সমস্যা। নির্বাচনমুখী ভাতা, পরিকল্পনাহীন প্রতিশ্রুতি, রাজস্বব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ—এসব কারণে ভাতা কখনো কখনো অর্থনীতির ক্ষতি করতে পারে। ভাতা দানের মধ্যে যদি রাজনৈতিক লাভের গন্ধ মিশে থাকে, তবে তা প্রকৃত কল্যাণ নয়, বরং জনপ্রিয়তার খেলা হয়ে দাঁড়ায়।ভাতা কি অধিকার, না কি সদাই? দরিদ্র নাগরিক কি ভিক্ষুক, না কি রাষ্ট্রের সমান নাগরিক? আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্র বলে—ভাতা মানুষের অধিকার; এটি রাষ্ট্রীয় সুবিচার, দয়া নয়।

এখানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—ভাতা যেন ক্ষমতায়নের সোপান হয়। আজকের বিশ্বে ভাতা সামাজিক ন্যায়, মর্যাদা ও মানবিকতার প্রতীক। তবে ভাতা দায়িত্বেরও প্রতীক—রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানুষকে রক্ষা করা, আর মানুষের দায়িত্ব সেই ভাতাকে স্বনির্ভরতার পথে ব্যবহার করা। এই দ্বিমুখী দায়িত্বই ভাতা ব্যবস্থাকে অর্থবহ করে তোলে। শেষ পর্যন্ত বলা যায়—হ্যাঁ, ভাতা সত্যিই ভালো কাজ করতে পারে, যদি এটি সঠিক পথে ব্যবহৃত হয়; আর যদি তা রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে তা সাময়িক প্রশান্তি দিলেও স্থায়ী উন্নয়ন আনে না। তাই প্রয়োজন সুষম নীতি, সৎ প্রয়োগ, অর্থনৈতিক স্থিতি, এবং ভাতা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা। মানুষের জীবনে ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভাতা অপরিহার্য, কিন্তু সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে ভাতার পাশাপাশি তৈরি করতে হবে শক্তিশালী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা। ভাতার প্রকৃত শক্তি এখানেই—মানুষকে বাঁচায়, কিন্তু মানুষকে এগিয়েও দেয়, যদি রাষ্ট্র ও সমাজ মিলিতভাবে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারে।